তাসলিমা আক্তার | রবিবার, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | ৫৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

‘তোমাকে উপড়ে নিলে, বলো তবে, কী থাকে আমার ?
উনিশ শো’ বাহান্নোর দারুণ রক্তিম পুষ্পাঞ্জলি
বুকে নিয়ে আছ সগৌরবে মহীয়সী।
মাতৃভাষার দুঃখিনী বর্ণমালাকে উদ্দেশ করে কবি শামসুর রাহমান ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’ কবিতায় লিখেছেন ১৯৫২ সালের কথা, ফেব্রুয়ারির কথা। ভাষা আন্দোলনকে স্মরণ করে লিখেছেন বাহান্নর দারুণ রক্তিম পুষ্পাঞ্জলির কথা। আকুলতা ও হাহাকার জানিয়ে বলেছেন, তোমাকে উপড়ে নিলে কী থাকে আমার ?
আজ রবিবার, ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন।
গৌরবের ভাষার মাস। মুখের ভাষা নিয়ে সংগ্রামমুখর স্মৃতির মাস ও রক্তে রাঙা আত্মত্যাগের মাস। বছর ঘুরে আবার এলো মহান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের স্মৃতিময় ও গৌরবময় মাস ফেব্রুয়ারি। ১৯৫২ সালের এই মাসে বাংলা মায়ের অকুতোভয় সন্তানরা নিজের বুকের রক্ত দিয়ে মায়ের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে।
মাতৃভাষার জন্য বুকের তাজা রক্ত দেওয়ার উদাহরণ পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটি আলাদা রাষ্ট্র হয়। তৎকালীন পাকিস্তানের একটি অংশ ছিল পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলা, যা আজকের বাংলাদেশ। যে আশা নিয়ে তৎকালীন পাকিস্তানের অংশ হয়েছে পূর্ব বাংলার মানুষ, সেই আশা ভঙ্গ হতে সময় লাগেনি।
পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে চাপিয়ে দিতে উদ্যত হয়। পাকিস্তানের জন্মের শুরুতেই ভাষার ওপর আঘাত, স্বপ্নভঙ্গের বেদনা। সেই আশাভঙ্গের বেদনা থেকেই পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে জন্ম নেয় বাঙালির ভাষাভিত্তিক চেতনা, সচেতনভাবে আত্মপরিচয় ও শিকড়ের অন্বেষণের যাত্রা। উন্মেষ ঘটে জাতীয়তাবাদের।বাঙালির সঙ্গে ভাষা নিয়ে চলা এই লড়াই চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে।
বায়ান্নর ফেব্রুয়ারি জুড়েই রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন ও সংগ্রামমুখর ছিল পূর্ব বাংলার মানুষ। আন্দোলন দমনে পুলিশ ঢাকা শহরে মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেই ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কাছাকাছি এলে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচার গুলিবর্ষণ শুরু হয়। রক্তে ভেসে যায় বায়ান্নর ঢাকার রাজপথ।
রাষ্ট্রভাষা বাংলার জন্য, মায়ের ভাষার জন্য আন্দোলনে শহীদ হন সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত, শফিউরসহ নাম না-জানা আরো অনেকে। তাঁদের রক্তের বিনিময়েই বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পায়। আজও তাই একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরিতে বেজে ওঠে সেই চেনা সুর—‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন পথ দেখায় এ অঞ্চলের মানুষদের। দুই দশকে একের পর এক আন্দোলন রূপ নেয় স্বাধিকার ও স্বাধীনতার চেতনায়। এরই পথ ধরে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ৯ মাসের মহান মুক্তিযুদ্ধ শেষে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় এক নতুন নাম—স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
শুরুতে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস হিসেবে পরিচিত হলেও পরে দিনটি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবেও খ্যাত হয়। ভাষার জন্য এই আত্মত্যাগ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর। এদিন জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এর পর থেকে দিনটি পৃথিবীর সব দেশে পালিত হয়ে আসছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে। দিনটি উদযাপনের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর সব মাতৃভাষা সংরক্ষণ ও বিকাশের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি এবার কিছুটা ভিন্ন আবহে হাজির হয়েছে। দরজায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন ঘিরে মানুষের মধ্যে রয়েছে নানা প্রত্যাশা। উৎসবের আমেজ ছাপিয়ে আছে অনিশ্চয়তাও। ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকে ঐতিহ্যগতভাবে অমর একুশে গ্রন্থমেলা শুরু হলেও এবার নির্বাচনী আবহ ও নিরাপত্তার কারণে তা হচ্ছে না। বাংলা একাডেমি এরই মধ্যে জানিয়েছে, আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হবে এবারের একুশে বইমেলা। তবে ভাষার মাস জুড়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করবে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো।



