রবিবার ১৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>

নারীর ফ্যাশনে ক্রস বডি ব্যাগ

রওনক জাহান পুষ্প,ঢাকা   |   বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   ১৯ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

নারীর ফ্যাশনে ক্রস বডি ব্যাগ

ব্যাগ আমাদের প্রতিদিনের জীবনে ওতপ্রোতভাবে জড়ানো। যেখানেই আমরা থাকি না কেন, ব্যাগ ছাড়া গুছিয়ে চলা কঠিন।আর তাই ব্যাগ এখন শুধু জিনিসপত্র নেওয়ার নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হয়ে জায়গা করে নিয়েছে ফ্যাশন ও অনুষঙ্গে। বিভিন্ন নকশায়, রঙে, আকারে আমাদের জীবনে স্থান পাকাপোক্ত করে নিয়েছে ব্যাগ।ব্যাগের সাইজ ও প্রয়োজন বুঝে ক্রসবডি ব্যাগ বর্তমানে ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

যুগে যুগে ব্যাগের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সঙ্গে এর স্টাইল, উপলক্ষ, দরকার ইত্যাদি সবই পরিবর্তিত হয়েছে।এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে ফ্যাশন এসেছে ক্রসবডি ব্যাগের। ক্রসবডি ব্যাগ মূলত লম্বা হাতল অথবা বেল্টওয়ালা ব্যাগ, যা শরীরের এক পাশ থেকে আড়াআড়ি গিয়ে অপর পাশে ঝুলে থাকে। এ ধরনের ব্যাগ বহনে সুবিধা হয়, ওজনের চাপ কম পড়ে এবং ঠিকমতো ক্যারি করা হলে ফ্যাশন জগতেও তাক লাগিয়ে দিতে পারে।হাতকে ঝামেলা মুক্ত রেখেই অনেক জিনিস নেওয়া যায় বলে এর জনপ্রিয়তাও এখন তুঙ্গে।

কীভাবে এলো ক্রসবডি ব্যাগ :
ক্রসবডি ব্যাগ হালের ফ্যাশন হলেও এর ইতিহাস মোটেই নতুন কিছু নয়। মানবসভ্যতার প্রায় শুরু থেকেই ব্যাগ বা থলে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ক্রসবডি ব্যাগ তারই একটা নিদর্শন বলা যায়। মূলত বর্তমান ক্রসবডি ব্যাগগুলোর সূত্রপাত হয়েছিল সাধারণ মানুষের হাতে, জিনিসপত্র বহনের সুবিধার কথা চিন্তা করে। শিকারি, পর্যটক ও ডাকপিয়নদের পছন্দ ছিল এমন ধরনের ব্যাগ, যা শরীরের সঙ্গেই থাকবে, সহজে চুরি করা যাবে না এবং জরুরি দরকারের জন্য হাত ফাঁকা থাকবে। মূলত তখন থেকেই ক্রসবডি ব্যাগের আইডিয়া জন্ম নিতে থাকে।
উনিশ শতকের শেষের দিকে ইউরোপীয় সমাজের এলিট ফ্যাশনে ঢুকতে থাকে ক্রসবডি ব্যাগ। তখনকার সময়ের অভিজাত মহিলারা বেস্ট ফ্যান্সি হ্যান্ডব্যাগ ব্যবহার করতেন। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর নারীরা যখন ধীরে ধীরে বিভিন্ন ধরনের কাজ, চাকরি ও ব্যবসায় যুক্ত হতে থাকেন, ফ্যান্সি তাদের জীবনে অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়ে। তাদের দরকার ছিল এমন ব্যাগ যাতে একটু বেশি জিনিস নেওয়া যাবে, কাজ করার জন্য হাত খালি থাকবে এবং প্রতিদিনের আসা-যাওয়ায় সুবিধা হবে। ধীরে ধীরে নারীরা বিভিন্ন ধরনের ক্রসবডি ব্যাগের দিকে ঝুঁকে পড়তে থাকেন এবং নারীদের ফ্যাশনে পাকাপাকি জায়গা করে নেয় ক্রসবডি ব্যাগ। এ ছাড়া হিপি আন্দোলন ও স্ট্রিট কালচারের কারণে তরুণ বয়সিরাও ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়ে ক্রসবডি ব্যাগের দিকে।

ক্রসবডি ব্যাগকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো। এদের মধ্যে ছিল ডিওর, শ্যানেল, গুচি এবং আরও অনেক নামকরা ব্র্যান্ড। নতুন ধরনের এই ব্যাগের দিকে নারীদের ঝুঁকে পড়া দেখে ব্র্যান্ডগুলো এই আইডিয়া লুফে নেয়, বিভিন্ন রকমের ডিজাইন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও এক্সপেরিমেন্ট শুরু করে দেয়। এর মধ্যে কিছু ডিজাইন সফল হয়েছিল, যেমন চ্যানেলের বিখ্যাত ফ্ল্যাপ ব্যাগ। প্রথমবারের মতো এই ব্যাগে ব্যবহার করা হয়েছিল লম্বা চেইন স্ট্র্যাপ; যা শরীরে আড়াআড়ি করে পরা যেত। তখনকার অভিজাত নারীরা এটিকে লুফে নেন এবং রাতারাতি এই নতুন ডিজাইন পরিণত হয় ফ্যাশন স্টেটমেন্টে।

সত্তরের দশকে নতুনভাবে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল হিপি সংস্কৃতি। যার মাঝে মুখ্য ছিল যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, বিভিন্ন রঙের পোশাক, চুল ইত্যাদি। অন্যরকম সাজ পোশাক ও গহনা, সব মিলিয়ে একেবারেই ভিন্নধর্মী ফ্যাশন। তখনকার তরুণ প্রজন্ম বেশ বড় কাপড়ের এমব্রয়ডারি করা বা হাতে রঙ করা ক্রসবডি ব্যাগ ব্যবহার করতে শুরু করে। মূলত স্বাধীনতা ও ব্যক্তিত্বের প্রতীক হিসেবে ব্যবহারের সুবিধার জন্য খুব ক্যাজুয়াল এই ব্যাগগুলো জনপ্রিয় হয়ে পড়ে।
এ ছাড়া এখন সোশ্যাল মিডিয়া ও গ্লোবাল ফ্যাশনে বেশ বড় একটা জায়গা দখল করে আছে ক্রসবডি ব্যাগ। শুধু ম্যাগাজিন বা সিনেমা নয়, সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও বড় বড় স্টারদের কাছেও শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন ডিজাইনের এসব ব্যাগ। ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে সবাই ব্যবহার করছেন পছন্দমতো ব্যাগ। পুরুষরা যেখানে মেসেঞ্জার ব্যাগ, স্লিং ব্যাগ বা ছোট লেদার ব্যাগ ব্যবহার করছেন, নারীরা সেখানে বেছে নিচ্ছেন হাজারো ভিন্ন রকমের স্টাইল থেকে। ক্যানভাস ব্যাগ, টোট স্টাইল ব্যাগ, রাউন্ড ব্যাগ, বক্স স্টাইল, বোহো স্টাইল, মিনিমাল স্টাইল নামের যেন কোনো শেষ নেই!

তবে শুধু স্টাইল নয়, যুগে যুগে ক্রসবডি ব্যাগ এই স্থান ধরে রেখেছে তার ব্যবহারযোগ্যতা ও সুবিধা দিয়ে। এই ব্যাগ সহজেই বহন করা যায়, যেকোনো দরকারে হাত ফাঁকা থাকে, নিরাপদে ও একসঙ্গে অনেক জিনিস রাখা যায়, কমবেশি সব ধরনের পোশাকের সঙ্গেই দেখতে ভালো লাগে। এসব কারণে মূলত এখনও সব বয়সিদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে রয়েছে ক্রসবডি ব্যাগ।

যেমন হয় ক্রসবডি ব্যাগ :

ক্রসবডি ব্যাগের হাজার হাজার ডিজাইন ও স্টাইল থাকলেও মূলত বেশ কিছু বিষয়ের ওপর এর মূল নকশা নির্ভরশীল থাকে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ট্র্যাপ অথবা বেল্টের দৈর্ঘ্য। শরীরে আড়াআড়ি করে ঝোলানোর কারণে এই ব্যাগের বেল্টের দৈর্ঘ্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া বেল্ট অথবা স্ট্র্যাপটি হতে হয় আরামদায়ক ম্যাটারিয়ালের তৈরি। এখন স্ট্র্যাপে পুরোপুরি চেইন অথবা চেইনের সঙ্গে অন্য কিছুর ফ্যাশনই বেশি চলছে।

আরেকটি বিষয় হলো এর আকার ও আকৃতি। প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন আকারের ক্রসবডি ব্যাগ হয়ে থাকে। সাধারণত প্রতিদিনকার জীবনে ব্যবহারের জন্য বড় আকারের ব্যাগ এবং বিশেষ উপলক্ষে ছোট ও জমকালো ব্যাগ ব্যবহৃত হয়। আকৃতির বাহার তো রয়েছেই! গোল, চারকোনা, লম্বা এসব সাধারণ আকার-আকৃতিকে ছাড়িয়ে ব্যাগের নকশা হয়ে উঠেছে নানামুখী। পশুপাখি যেমন ভাল্লুক, পেঁচা, বিড়াল ইত্যাদির আকার, বিভিন্ন ফলের আকার, ভায়োলিনের আকারসহ অনেক রকমের ডিজাইনেই এখন পাওয়া যাচ্ছে এ ব্যাগগুলো। পার্টি অথবা ক্যাজুয়াল আউটিং এ খুব অল্প জিনিসপত্র নেওয়ার জন্য মিনি ক্রসবডি ব্যাগ ব্যবহৃত হয়। প্রতিদিনকার ব্যবহারের জন্য মিডিয়াম সাইজ এবং কোথাও যাওয়া অথবা বেশি জিনিসপত্র নেওয়ার জন্য বড় সাইজের ব্যাগগুলো বেশি উপযোগী।
সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি হলো এর উপকরণ ও নকশা। বিভিন্ন ধরনের জিনিস দিয়েই ক্রসবডি ব্যাগ তৈরি হয়। চটের কাপড়, ক্যানভাস কাপড়, চামড়া, পাটের দড়ি, এগুলোই মূলত সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। নকশার ক্ষেত্রে হাতে আঁকা, সুঁই-সুতার এমব্রয়ডারি, আলগা ফুল ও পাথর ইত্যাদি অনেক কিছুই ব্যবহার করা হয়। কাউকে কাউকে তো ছোট আকারের মেটাল অথবা গ্লাস ক্রসবডি পাস নিয়েও ঘুরতে দেখা যায়! অভিজাত ও ফরমাল ফ্যাশনে উন্নত মানের চামড়ার ব্যাগ সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। বড় বড় ব্র্যান্ডগুলোও একে প্রাধান্য দেয়। বাংলাদেশের ফ্যাশনে জামদানি, নকশিকাঁথা, পটচিত্র, বিভিন্ন ধরনের গ্রামের দৃশ্য প্রিন্ট করা ব্যাগগুলোই বেশি প্রচলিত।

দেশি ফ্যাশনে ক্রসবডি ব্যাগ :

২০১৮ সাল থেকে ব্যাগের দুনিয়ায় পা রেখেছে বিখ্যাত অনলাইন ভিত্তিক বাংলাদেশি ব্যাগ শপ দ্য হকার্স। তাদের যাত্রা শুরুর প্রথম দিকের প্রোডাক্টেই ছিল ডেনিম ক্রসবডি ব্যাগ। মূলত স্টুডেন্টদের কথা মাথায় রেখে শুরু করা হলেও ডিজাইন ও ব্যবহার অনুযায়ী প্রায় সব বয়সি ক্রেতারাই পছন্দ করে এই ব্যাগ নিচ্ছেন বলেই জানা যায় স্বত্বাধিকারী তাসনিয়া ইরার কাছ থেকে। তিনি এটাও বলেন, প্রতিদিনের ব্যবহার, ক্যাজুয়াল ঘোরাঘুরি বা ট্রাভেলের জন্য এসব ব্যাগ খুব কমফোর্টেবল এবং এগুলোর চাহিদাও বেশি। দ্য হকার্স তাদের সব প্রোডাক্টই নিজেরা ডিজাইন করে থাকে। ডিজাইন করার সময় নতুনত্ব আর ম্যাটেরিয়ালের সঙ্গে ঠিকঠাক স্পেসের ব্যাপারটাও খেয়াল রাখেন তারা। অন্তত একটা পানির বোতল, ছোটখাটো টুকটাক জিনিস, অল্প স্বল্প কসমেটিকস যাতে নেওয়া যায়, এমন সাইজটাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। ম্যাটেরিয়াল হিসেবে বেছে নেওয়া হয় টেকসই কিছু। বর্তমানে ক্রেতারা একটু উজ্জ্বল ও রঙিন ব্যাগই বেশি পছন্দ করছেন বলে জানা যায়। মূলত কর্মজীবী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যেই এই ধরনের ব্যাগগুলো বেশি জনপ্রিয়। শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ বা ওয়েস্টার্ন, সব ধরনের পোশাকের সঙ্গেই সুন্দরভাবে মানিয়ে যায় এগুলো। দ্য হকার্স কাস্টমাইজড অর্ডার না নিলেও নতুন উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনে মিনিমাম অর্ডারে আলাদা প্রোডাকশন করে থাকে।

২০২১ সালে বিভিন্ন ধরনের ব্যাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করে এফ কমার্স অর্গানাইজেশন কালিন্দী। তাদের শুরু থেকেই ক্রসবডি ব্যাগের আলাদা চাহিদা ছিল বলে জানান এর স্বত্বাধিকারী মুনিয়া জামান। সাধারণত ক্যাজুয়াল ব্যবহার ও ঘোরাঘুরির জন্যই ব্যবহৃত হয় ক্রসবডি ব্যাগ। ক্যারি করতে সহজ বলে সব বয়সের ক্রেতারাই পছন্দ করেন। কালিন্দীতে মূলত লেদার ও পাটের তৈরি কয়েকটি রঙের মধ্যে এই ব্যাগ পাওয়া যায়। পাটের ব্যাগের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক রঙগুলোকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়, এর মধ্যে নীল রঙের চাহিদা সবচেয়ে বেশি বলে জানা যায়। কালিন্দী কিছু করপোরেট কাজ করে, তবে সেক্ষেত্রে ডিজাইন পরিবর্তন হয় না, শুধু লোগো হয়।

কোথায় পাওয়া যায় :

দেশি ফ্যাশনে জনপ্রিয় হওয়ার পর ক্রসবডি ব্যাগ ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে। বেশিরভাগ ব্যাগের দোকানেই এখন লম্বা, পাশে ঝোলানো ক্রসবডি ব্যাগ পাওয়া যায়। ব্যাগের ডিজাইন, ধরন ও ম্যাটেরিয়াল বুঝে বিভিন্ন রকমের দামে পাওয়া যায়। সাধারণত ১৫০ টাকা থেকে ক্যানভাস ব্যাগগুলোর দাম শুরু হয়। একটু ফ্যান্সি ব্যাগগুলো ৭০০ থেকে কয়েক হাজারের মধ্যেও হতে পারে দাম। ঘুরতে বা ট্যুরে যাওয়ার জন্য নকশা করা ঘরে বোনা ব্যাগও পাওয়া যায়। এগুলোর দাম কয়েক হাজারের মধ্যেই। ঢাকার বিভিন্ন বড় বড় মার্কেটে এসব ব্যাগ পেয়ে যাবেন। অনলাইনে কালিন্দী ও দ্য হকার্স ছাড়াও বেশ কিছু ফেসবুক পেজ রয়েছে, যারা বাইরে থেকে আমদানি করে কিছু নতুন ডিজাইনের ব্যাগ।

যেকোনো প্রয়োজনে হুটহাট বেরিয়ে পড়তে ফ্যাশন স্টেটমেন্ট বেছে নিতে পারেন এই ব্যাগগুলো। ফ্যাশনের সঙ্গে সুবিধা, এটাই তো চাহিদা!

Facebook Comments Box
আরও

এ বিভাগের আরও খবর

Chief Editor
Shahan Ahmed Chowdhury
Editor
J U Sumon
News Editor
Mehdi Hassan
UK Office
USA OFFICE
  • Hasan Hafizur Rahman
    264/A,Central Avenue
    Garden City
    NY 11040
    USA
সিলেট ব্যুরো
  • আব্দুর মুক্তাদির
    সিটি কর্পোরেশন মার্কেট (২য় তলা)
    চালিবন্দর, সোবহানীঘাট, সিলেট।
ঢাকা ব্যুরো
  • সৈয়দ আবু নাসের
    এমএস প্লাজা ২৮/সি/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০