আবু হাসান মিয়া,দিরাই সুনামগঞ্জ | রবিবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | প্রিন্ট | ৬০ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

সুনামগঞ্জ জেলার অন্তর্গত দিরাই উপজেলা তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশের জন্য পরিচিত। কালনী নদীর কূল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই জনপদ যেন প্রকৃতির এক অপার দান যা ভ্রমণপিপাসুদের মন কেড়ে নেয় অনায়াসে। বর্ষায় দিরাইয়ের অনিন্দ্য সৌন্দর্য হাওরের বুকে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা।
দিরাই, সুনামগঞ্জ জেলার এক শান্ত উপজেলা, যা বর্ষাকালে তার রূপ মেলে ধরে এক ভিন্ন রূপে। বর্ষার আগমনীর সাথে সাথে হাওরের জলরাশি যখন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন দিরাইয়ের প্রকৃতি যেন নবযৌবন লাভ করে। চারদিকে শুধু অথৈ জল আর সবুজের সমারোহ যা আগত পর্যটকদের মনকে এক অনাবিল প্রশান্তিতে ভরিয়ে তোলে।
নদীমাতৃক রূপ: দিরাইয়ের সৌন্দর্য মূলত এর নদীমাতৃক রূপে নিহিত। কালনী, হেরাচাপ্টি, চামটি নদী এই অঞ্চলের জীবনরেখা। নদীর দু’পাশের সবুজ ফসলের খেত, ছোট ছোট গ্রাম আর জেলেদের কর্মব্যস্ততা এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। বর্ষাকালে যখন নদী কানায় কানায় ভরে ওঠে, তখন এর রূপ আরও মোহনীয় হয়ে ওঠে। নৌকা ভ্রমণে বের হলে চারপাশের নির্মল বাতাস আর দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি মনকে শান্তিতে ভরিয়ে তোলে।
সবুজের সমারোহ: দিরাইয়ের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এর সবুজের সমারোহ। শুষ্ক মৌসুমেও এখানকার ফসলের খেত সবুজে মোড়া থাকে।
গ্রামগুলোর চারপাশে গাছগাছালি আর বাঁশ ঝাড় এক শীতল ছায়া তৈরি করে, যা শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির মাঝে স্বস্তি এনে দেয়। বিশেষ করে ধানের চারা লাগানোর পর বা ধান পাকার আগে যখন দিগন্ত জোড়া সবুজ বা সোনালী ধানক্ষেত দেখা যায়, তখন এর সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ জীবন: দিরাই শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেই নয়, এর ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ জীবনও পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। কিছু এলাকার মাটির ঘর, প্রত্যন্ত অঞ্চলের কিছু এলাকার গরুর গাড়ি, আর সহজ-সরল গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রা এখানকার এক ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। সন্ধ্যা নামলে চাঁদের আলোতে এখানকার শান্ত পরিবেশ আরও মায়াবী হয়ে ওঠে।
পর্যটকদের জন্য সম্ভাবনা: পর্যটন শিল্পের জন্য দিরাইয়ের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায় এবং পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা যায়, তাহলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন এবং পর্যটন সংশ্লিষ্টরা এই বিষয়ে উদ্যোগী হলে দিরাই দেশের পর্যটন মানচিত্রে একটি উজ্জ্বল স্থান করে নিতে পারবে।
এব্যাপারে উপজেলা কর্মকর্তার সাথে হলে তিনি এ প্রতিবেদক কে জানান, দিরাই সৌন্দর্য্যকে তুলে ধরতে এবং দিরাই’র পর্যটন কেন্দ্রকে বিকশিত করতে দিরাইয়ে গড়ে তুলা হয়েছে কালনী রিভারভিউ, দিরাই’র মিনি কক্সবাজার হিসেবে পরিচিত পাওয়া দল রোডে গড়ে তুলা হয়ছে নান্দনিক অবকাঠামো। যা পর্যটকদের বাড়তি আকর্ষণ দিবে।
তবে দিরাই’র দল (মিনি কক্সবাজার)নামে পরিচিত পাওয়া প্রাকৃতি প্রেমিদের আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়ে, এছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে কালনী রিভারভিউ, যা পর্যটকদের মনে নতুন আশার আলো জাগিয়েছে।
দিরাই’র চাপাতি হাওরে ঘুরতে আসা অনেকের সাথে কথা হলে তারা বলেন, আসলেই বর্ষায় দিরাই’র সৌন্দর্য্য দেখে তারা মুগ্ধ, হাতের কাছে এতো সুন্দর ভিউ থাকতে কেনো আমরা কক্সবাজার ছুটে যাব, এই চাপাতি হাওরের মাঝেই সাগরের সাধ খুজে পাওয়া যায়।
বর্ষাকাল এলেই হাওরাঞ্চল তার রূপ পরিবর্তন করে এক নতুন সাজে সেজে ওঠে। আর সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলা বর্ষায় হয়ে ওঠে এক অসাধারণ সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি। চারপাশে অথৈ জলরাশি, নৌকা আর জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ-সব মিলিয়ে দিরাইয়ের বর্ষার সৌন্দর্য যেন প্রকৃতিপ্রেমীদের হাতছানি দেয়।
দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঘুরতে আসা পর্যটকরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “দিরাই’র বর্ষার রুপ যেনো আল্লাহ নিজ হাতে গড়েছেন।কথা হয় সিলেট জেলার বিশ্বনাথ উপজেলার সাদিকুলের সাথে, তিনি বলেন, এমন বিশাল জলরাশি দিরাই আসলে দেখা যায়, যাদের টাকা খরচ করে কক্সবাজার যাওয়ার সার্মথ্য নাই তাদের বলি একবার ঘুরে আসুন দিরাই। মন ভালো হয়ে যাবে বর্ষায় দিরাইয়ের প্রধান আকর্ষণ হলো বিস্তীর্ণ হাওর। যখন চারপাশ পানিতে থৈ থৈ করে, তখন গ্রামগুলো যেন একেকটি ছোট ছোট দ্বীপের মতো ভেসে থাকে। সবুজ ধানক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে এক অন্যরকম দিগন্ত তৈরি করে যেখানে আকাশ আর জল মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এই সময়ে নৌকা হয়ে ওঠে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। ইঞ্জিনচালিত ট্রলার বা ডিঙি নৌকায় হাওরের বুক চিরে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা এক কথায় অসাধারণ।
পর্যটকদের জন্য দিরাইয়ের বর্ষাকাল এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। যারা নিরিবিলি এবং প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটাতে চান, তাদের জন্য দিরাই হতে পারে আদর্শ গন্তব্য। হাওরের মাঝে ছোট ছোট বাজারে নৌকায় করে মানুষের আনাগোনা, জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য-এই সবই বর্ষার দিরাইকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। স্থানীয় সংস্কৃতি ও জীবনযাপনকে কাছ থেকে দেখারও এটি একটি সুবর্ণ সুযোগ।
তবে বর্ষায় দিরাইয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও থাকে। যোগাযোগ ব্যবস্থা কিছুটা বিঘ্নিত হতে পারে এবং আবহাওয়া হঠাৎ পরিবর্তনশীল হতে পারে। তবুও, যারা প্রকৃত অ্যাডভেঞ্চার ভালোবাসেন এবং প্রকৃতির আসল রূপ দেখতে চান তাদের জন্য দিরাইয়ের বর্ষা এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে।
দিরাইয়ের এই অপরূপ সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটানো সম্ভব। পর্যটকদের জন্য উন্নত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে বর্ষার দিরাই হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। প্রকৃতির এই দানকে রক্ষা করে এবং এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে দিরাই তার সৌন্দর্য দিয়ে আরও অনেক মানুষকে মুগ্ধ করবে এমনটাই আশা করা যায়।



