বুধবার ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

সুফিয়া কামাল ছিলেন মানুষের আশ্রয়স্থল

অর্চি হক,ঢাকা   |   রবিবার, ২১ জুন ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৪ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

সুফিয়া কামাল ছিলেন মানুষের আশ্রয়স্থল

কবি সুফিয়া কামালের ১১৫তম জন্মবার্ষিকী ২০ জুন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন সংগঠনের বর্তমান সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। অনুলিখনে অর্চি হক।

সুফিয়া কামালকে আমি চিনেছি তাঁকে প্রথম দেখারও অনেক আগে। স্কুলজীবনে তাঁর কবিতা পড়েছি পাঠ্যবইয়ে। বাসায় ‘বেগম’ পত্রিকা আসত, সেখান থেকেও তাঁর সম্পর্কে কিছুটা জানা ছিল। ফলে তাঁকে নিয়ে একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল। তবে কাছ থেকে চেনার সুযোগ আসে ষাটের দশকের শেষ দিকে, যখন আমরা নারী সংগঠন গড়ে তোলার কথা ভাবছিলাম।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের জন্মের পেছনে সুফিয়া কামালের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তিনি বলেছিলেন, ‘সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সংগঠন আছে, কিন্তু নারীদের নিজস্ব কোনো সংগঠন নেই। নারীদেরও একটি সংগঠন গড়ে তোলা দরকার।’ তাঁর সেই উৎসাহ আর প্রেরণা থেকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের যাত্রা শুরু হয় এবং নারী আন্দোলনের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে।

১৯৬৮-৬৯ সালের দিকে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। তখন আমি মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। নারী রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির দাবিতে নারীদের স্বাক্ষর সংগ্রহের একটি উদ্যোগ নিয়েছিলাম আমরা। সেই কাজ করতে গিয়েই সুফিয়া কামালের সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ। এরপর যত দিন তিনি বেঁচে ছিলেন, মহিলা পরিষদের কাজের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন।

সুফিয়া কামালকে আমরা ‘খালাম্মা’ বলতাম। তাঁকে যত দেখেছি, ততই বিস্মিত হয়েছি। বাইরে থেকে তিনি ছিলেন একেবারেই সাধারণ একজন নারী—যেন আমাদের ঘরের মা বা খালার মতো। কিন্তু কথা বলতে শুরু করলেই বোঝা যেত, তাঁর ভেতরে কী অসাধারণ শক্তি ও দৃঢ়তা কাজ করছে। তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল আলাদা মাপের।

তাঁর জীবনের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল সাহস। অল্প বয়সে স্বামী হারানোর পর যে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাঁকে যেতে হয়েছে, সেই সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় একজন নারীর জন্য তা সহজ ছিল না। কিন্তু তিনি কোনো কটূক্তি বা সামাজিক বাধাকে গুরুত্ব দেননি। নিজের অবস্থান থেকে কাজ করে গেছেন, লিখেছেন, সমাজ পরিবর্তনের জন্য নিরলসভাবে কাজ করেছেন।

আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, তিনি কখনো এক জায়গায় থেমে থাকেননি। সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলেছেন, সমাজ বদলানোর চেষ্টা করেছেন। যে সমাজে নারীর ছবি তোলা নিয়ে আপত্তি ছিল, সেখানে তিনি ছবি তুলেছেন। যে সমাজে নারীর লেখালেখিকে ভালো চোখে দেখা হতো না, সেখানে তিনি লেখক হয়েছেন। প্রতিটি বাধা অতিক্রম করে তিনি এগিয়ে গেছেন।

সুফিয়া কামাল শুধু একজন নেতা ছিলেন না, ছিলেন মানুষের আশ্রয়স্থল। ধর্ম, বর্ণ, মত কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়-নির্বিশেষে যে কেউ তাঁর কাছে যেতে পারত। তাঁর ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ ছিল সে রকমই। ফলে নানান মত ও পরিচয়ের মানুষ তাঁর কাছে আসত, তাঁর সান্নিধ্য চাইত। তাঁর আরেকটি বড় গুণ ছিল কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা। তিনি বলতেন, ‘আমি কোনো রাজনীতি করি না, আমার বিবেকই আমার রাজনীতি।’ নিজের বিবেকের কাছে জবাবদিহির এই মানসিকতা তিনি গভীরভাবে ধারণ করতেন। অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করা ছিল তাঁর সহজাত প্রবৃত্তি।

নারায়ণগঞ্জে যৌনপল্লি উচ্ছেদের ঘটনায় যখন প্রায় সবাই নীরব, তখন সুফিয়া কামাল বলেছিলেন, ‘তারা তো মানুষ, তাদেরও অধিকার আছে।’ এই অবস্থান নেওয়ার জন্য আলাদা সাহসের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তাঁর কাছে এটি ছিল মানবিকতার স্বাভাবিক দাবি। তিনি সব সময় নির্যাতিত, বঞ্চিত ও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

নারীর অধিকারকে মানবাধিকারের প্রশ্ন হিসেবে বাংলাদেশে যাঁরা তুলে ধরেছেন, সুফিয়া কামাল তাঁদের অন্যতম। সমাজে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে তিনি বিবৃতি দিতেন, মানুষকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানাতেন। খুব সংক্ষিপ্ত ভাষায় তিনি সময়ের প্রয়োজনীয় করণীয় নির্ধারণ করে দিতে পারতেন।

সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলন, নারী সংগঠন, শিশু সংগঠন, রবীন্দ্রসংগীত চর্চা—সব ক্ষেত্রে তিনি ভূমিকা রেখেছেন। যেখানে যে কাজের প্রয়োজন হয়েছে, সেখানেই তাঁকে দেখা গেছে। তিনি জীবনের একটি মুহূর্তও অপচয় করেননি।

তাঁর সাহিত্যকর্মও বিস্ময় জাগায়। ‘সৈনিক বধূ’র মতো লেখা পড়লে মনে হয়, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা কোনোভাবেই তাঁর সৃজনশীলতাকে আটকে রাখতে পারেনি। মানুষের মন, সমাজ ও সময়কে তিনি গভীরভাবে অনুভব করতে পারতেন।

আজও ভাবি, কীভাবে একজন মানুষ এত প্রতিকূলতার মধ্যেও মানুষের প্রতি আস্থা, বিশ্বাস ও ভালোবাসা ধরে রাখতে পেরেছিলেন। একটা ছোট্ট মেয়ে, যে বাবাকে দেখেনি, মায়ের স্নেহে বড় হয়েছে। শুধু মামাদের লাইব্রেরির বই পড়েই কি তাঁর মন এত প্রসারিত হয়েছিল? তিনি কেন সব প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করার চেষ্টা করেছেন? না করলেও তো পারতেন। প্রচলিত সামাজিক নিয়ম মেনেই জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু সেটা তিনি করেননি। এই শক্তি এবং সাহস তিনি কীভাবে পেতেন, এটা গভীরভাবে ভাবার বিষয়।

আমার মনে হয়, মানুষের প্রতি ভালোবাসাই ছিল তাঁর শক্তির উৎস। মানুষের ওপর বিশ্বাস হারাননি বলেই তিনি বারবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার কাজ করেছেন। এর সঙ্গে ছিল সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং নিরলস পথচলার সংগ্রাম।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনিরবি
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০ 

ফলো করুন Ajker Desh UK-এর খবর

Chief Editor
Shahan Ahmed Chowdhury
Editor
J U Sumon
News Editor
Mehdi Hassan
UK Office
USA OFFICE
  • Hasan Hafizur Rahman
    264/A,Central Avenue
    Garden City
    NY 11040
    USA
সিলেট ব্যুরো
  • আব্দুর মুক্তাদির
    সিটি কর্পোরেশন মার্কেট (২য় তলা)
    চালিবন্দর, সোবহানীঘাট, সিলেট।
ঢাকা ব্যুরো
  • সৈয়দ আবু নাসের
    এমএস প্লাজা ২৮/সি/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০