সাদেকুর রহমান,ঢাকা | সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬ | প্রিন্ট | ০ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। প্রতিটি ঋতুই এই দেশের মানুষের জন্য আলাদা অনুভূতি নিয়ে আসে। একেক ঋতুতে মানুষের আবেগের বহিঃপ্রকাশ একেক ভাবে ঘটে থাকে। কিন্তু প্রতিটি ঋতুই বাংলাদেশের মানুষ উৎসব পালনের মধ্য দিয়ে উদযাপন করে। ঋতুভেদে এইগুলোর নাম ভিন্ন হয়। যেমনÑ বর্ষাবরণ, শরৎবরণ, বসন্ত উৎসব ইত্যাদি। বাংলা সন বিবেচনাতে নিলে বাংলাদেশের প্রথম ঋতু হলো গ্রীষ্মকাল। বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ এই দুই মাস নিয়ে হলো গ্রীষ্মকাল। গ্রীষ্মকাল বরণ করার সাথে সাথে নতুন বছর বরণ করা হয়। বাংলাদেশের যে কয়টি সর্বজনীন উৎসব আছে, বাংলা নববর্ষ তার মধ্যে অন্যতম। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনটিকে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হয়। এটিকে যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সীমিত করে রাখার সুযোগ নেই। এই উদযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক দিকও রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পহেলা বৈশাখের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি হলো কৃষিনির্ভর। বাংলা নববর্ষের সূচনা মুঘল সম্রাট আকবরের হাত ধরে হয়েছে। তখন কৃষকদের করা আদায় করা হতো আরবি হিজরি সালের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু বাংলাদেশের ঋতুর সাথে হিজরি সাল মিলত না। এর ফলে দেখা যেত ফসল ওঠার আগেই কর আদায়ের সময় চলে এসেছে। কৃষকরা সমস্যার মধ্যে পড়ত। এই সমস্যাকে দূর করার জন্য তিনি বাংলায় নতুন ফসলি বছর প্রবর্তন করেন। এর ফলে কর আদায়ের ব্যবস্থা সহজ হয়। কৃষকদের মনে স্বস্তি বিরাজ করে। সময়ের পরিক্রমাতে এটি বঙ্গাব্দ নামে পরিচিতি লাভ করে। এতে কৃষির ফসল আদায়ের সাথে সমন্বয় করে নতুন বর্ষপঞ্জির প্রয়োজন হয়। সম্রাট আকবরের নির্দেশে ফতে উল্লাহ সিরাজি এটি প্রণয়ন করেন।
প্রতিটি নতুন কিছু প্রবর্তনের সাথে আরও নতুন উৎসব সাংস্কৃতির সাথে যুক্ত হয়। নতুন বর্ষপঞ্জির সাথে সাথে বাংলার মানুষের সাথে নতুন একটি উৎসবের পরিচয় হয়। হালখাতা তেমনই একটি উৎসব । চৈত্র মাসের মাধ্যমে বাংলা বর্ষের সমাপ্তি হয়। ব্যবসায়ীরা চৈত্র মাসের শেষ দিনে ওই বছরের হিসাব শেষ করে দেয়। এজন্য যে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, তার নাম হলো চৈত্রসংক্রান্তি। এই অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীরা গ্রাহকদের মিষ্টি মুখ করায়। গ্রামে গ্রামে মেলা বসে। এইসব মেলাতে বিভিন্ন ধরনের পণ্য পাওয়া যায়। বিভিন্ন মানুষ এগুলো ক্রয় করে। এগুলো তৈরিতে ব্যবহার করা হয় বাঁশ, মাটি ইত্যাদি। মানুষের জীবনের হাসি-কান্না, দুঃখ-কষ্ট ফুটে ওঠে। তাই শুরু থেকেই বৈশাখ উৎসব কৃষি, বাণিজ্য ও গ্রামীণ শিল্পের সাথে গভীরভাবে জড়িত। এটি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে।
হালখাতার প্রচলন এখন নেই বললেই চলে। তাই বলে বৈশাখের অর্থনৈতিক প্রভাব কমে যায়নি। এখন মানুষ দ্রুত সময়ে লেনদেন করে থকে। এখন বৈশাখকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে একটি বিশাল অর্থনীতির চাকা ঘোরে।
মানুষ এখন ফ্যাশনসচেতন। যেকোনো উৎসবে মানুষ নতুন নতুন পোশাক কিনতে চায়। বৈশাখ ও তার ব্যতিক্রম নয়। এই সময় শাড়ি, পাঞ্জাবির চাহিদা অনেক বেড়ে যায় নতুন ডিজাইনের কাপড় কেনার জন্য মানুষ মুখিয়ে থাকে। বিভিন্ন ফ্যাশন প্রতিষ্ঠান এই সময়ের জন্য অপেক্ষা করে থাকে। প্রতি বছর ফ্যাশন হাউসগুলো কয়েকশ কোটি টাকা বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে। এই হিসাব শুধু ব্র্যান্ড ফ্যাশন হাউসের জন্য। এ ছাড়া স্থানীয় পোশাক নির্মাতারাও অনেক বিক্রি করে থাকেন।
বৈশাখী মেলা বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই মেলাতে বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প, পাটের পণ্য, বাঁশের তৈরি পণ্য বিক্রি করা হয়। নারীদের কাছে মাটির গয়না, কাঠের অলংকারের আলাদা চাহিদা থাকে। অনেক নারীই বিভিন্ন ধরণের শাড়ি ক্রয় করে থাকেন। বেশিরভাগ শাড়ির ডিজাইন করা হয় বাংলার সংস্কৃতিকে মাথায় রেখে। বৈশাখী মেলার সময় হাজার হাজার ক্ষুদ্র শিল্পী ও কারিগর তাদের পণ্য বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। গ্রামীণ নারীদের আয়ের একটি উপায় হলো এই বৈশাখ মেলা।
পান্তা-ইলিশ বৈশাখের একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার। বাংলাদেশের ইলিশের আলাদা চাহিদা আছে। বাঙালি পহেলা বৈশাখে এই খাবার খেতে খুব পছন্দ করে। এটিতে কোনো শ্রেণিবিভেদ নেই। সকল স্তরের মানুষ এটি আগ্রহ নিয়ে খেয়ে থাকে। এই সময় বাজারে ইলিশের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। এটি বর্তমানে বাংলা নববর্ষের অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি মেলাতেই পান্তা-ইলিশের একটি স্টল থাকে। বিভিন্ন বয়সী মানুষ এই খাবার খাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। সাধারণত তরুণরা মেলার স্টলগুলো দিয়ে থাকে। স্টলগুলতে বিভিন্ন পণ্য ও খাদ্যসামগ্রী বিক্রি করে ভালো আয় হয়ে থাকে। অনেকে পান্থা-ইলিশ না খেয়ে ইলিশ-খিচুড়ি খেতে চায়। এর ফলে খাবারের ক্ষেত্রে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। মানুষের স্বাদে ভিন্নতা আসে। এ সময় বিভিন্ন খাদ্যপণ্য যেমন ফল, মাছ, মাংসের চাহিদাও অনেক বেড়ে যায়। এর ফলে বাজার প্রসারিত হয়।
মানুষ একে অপরকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানাতে ফুল ব্যবহার করে থাকে। সারা বছর ফুলের চাহিদা থাকলেও নববর্ষের প্রথম দিনে ফুলের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। এই সময় ফুলের ব্যবসা স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে থাকে। ফুলের ব্যবহার গ্রামে কিংবা শহর সব জায়গায় হয়ে থাকে। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীরা বেশি ব্যবহার করে থাকে।
আমরা এখন প্রযুক্তির যুগে বসবাস করছি। এখন কোনো একটি উৎসবকে প্রায় সকল করপোরেট প্রতিষ্ঠান নিজেদের বিপণনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। বৈশাখ কিংবা নববর্ষ ও এর ব্যতিক্রম নয়। বিভিন্ন কোম্পানি, বৈশাখী মেলা, উন্মুক্ত কনসার্ট, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে। বাংক, বীমা, টেলিকম কোম্পানি বৈশাখকে কেন্দ্র করে বিশেষ প্রচারণা চালায়। মোবাইল কোম্পানিগুলো বৈশাখ উপলক্ষে বিভিন্ন ধরনের অফার দিয়ে থাকে।
সরকার সরকারি চাকরিজীবীদের বাংলা নববর্ষ ভাতা প্রদান করে। প্রতি বছরই বৈশাখ উদযাপন করার জন্য হাজার কোটি টাকার বেশি বাজার সৃষ্টি হয়। এই বিশাল অঙ্কটি প্রমাণ করে যে বৈশাখ এখন কেবল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। বরং এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক মৌসুম ভাবার সময় এসেছে। প্রতিবছর এই বাজারের পরিধি বেড়ে চলেছে।
অনেকে মনে করেন যে, ভবিষ্যতে পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ খাত হয়ে উঠব। কারণ বৈশাখের সময় করপোরেট বিনিয়োগ ও ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা উভয়ই বেড়ে যায়। এ ছাড়া এ সময় গ্রামীণ শিল্পের প্রসার হয়। এর ফলে অর্থনীতির পরিধি অনেক বেড়ে যায়।
বৈশাখ বাঙালির সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে আছে। এই অর্থনৈতিক চর্চা সংস্কৃতির বাণিজ্যিকীকরণ ঘটাছে। ফলে এই উৎসবটি প্রসার হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পর্যন্ত এই ধারাটি পৌঁছিয়ে দিচ্ছে। এখন শুধু গ্রামের নারীরা পিঠা-পুলি করেন তেমন নয়, শহরের বিভিন্ন রেস্তোরাঁ, ফুড স্টলেও পিঠা-পুলি পাওয়া যায়। অনেকে পিঠা-পুলি, হস্তশিল্পের পণ্যের অনলাইনেও ব্যবসা করে থাকেন। এটি শিল্পকে বাণিজ্যিক ভিত্তি দিয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সাহায্য করবে।
বাংলাদেশের বৈশাখ অর্থনীতি এখন শুধু দেশের মধ্য সীমিত নেই। যেখানেই বাঙালি আছে, সেখানেই এই উৎসব পালন হয়। এর ফলে বিদেশে ও বাংলাদেশের পণ্য, সংস্কৃতি ও শিল্পের জন্য একটি আন্তর্জাতিক বাজার তৈরি হয়েছে। এই সুযোগটি আমাদের কাজে লাগানো দরকার। বিশ্বের বিভিন্ন শহরের এই উৎসব উদযাপন করা হয়ে থাকে। এসব অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে তৈরি কুটির পণ্যের চাহিদা বেড়ে চলেছে।
বৈশাখের অর্থনীতির কিছু দিকের দিকে আলাদা নজর দেওয়া যেতে পারে। পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কোনো ধরনের নকল ও নিম্নমানের পণ্য যেন না যায় এদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এই সময় ইলিশ মাছ প্রচুর রপ্তানি করা হয়। শুধু তাই নয়, ইলিশ মাছ কূটনীতির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে। এ সময় স্থানীয় বাজারে ইলিশ মাছের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা দরকার। পরিবেশগত বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। পরিবেশের দূষণ হ্রাস করতে হবে। প্লাস্টিক, পলিথিনের ব্যবহার কমাতে হবে। আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেমনÑ পরিবেশ উপযোগী পণ্যের প্রচলন, গ্রামীণ হস্তশিল্পীদের ব্যাংক ঋণ প্রদান করা যেতে পারে।
সংস্কৃতি ও অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক। প্রথমদিকে হালখাতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক কার্যাবলি শুরু হলেও ধীরে ধীরে এটি বাংলাদেশের জন্য বড় একটি শিল্পে পরিণত হতে পারে। তাই এটিকে শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে আছে বড় একটি বাজার। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য যার সম্ভাবনা অপরিসীম।
সাদেকুর রহমান , জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড



