রাবেয়া সুলতানা,ঢাকা | মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | ৬৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

বাংলাদেশের রাজনীতির এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এক গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সংলাপ সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত ‘গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা সংস্কার ও নির্বাচনী ইশতেহার’ শীর্ষক এই বিভাগীয় সংলাপে উঠে এসেছে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে গভীর উদ্বেগ, শঙ্কা এবং অন্তর্বর্তীকালীন সংস্কারের অপরিহার্যতা।নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ২৯ দিন, অথচ দেশে এখনো সুস্থ নির্বাচনী আমেজ তৈরি হয়নি, এমন পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থা এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশিষ্ট জনেরা।
সংলাপের শুরুতেই গুরুত্ব পায় বর্তমানের নড়বড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। জুলাই অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র এবং কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া আসামিদের নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন আলোচকেরা। বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক নিলুফার চৌধুরী মনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বর্তমান পরিস্থিতির সমালোচনা করেন।
তিনি জানান, গণ-অভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া ১ হাজার ৩৩৫টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি এবং কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ৭১৩ জন দাগী আসামি এখনো মুক্ত অবস্থায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই বাস্তবতায় নির্বাচন কতটা নিরাপদ হবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমানে কোনো ‘মব’ বা গণপিটুনির ঘটনা ঘটলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়, যা সাধারণ মানুষের মনে ভীতির সৃষ্টি করছে।
নির্বাচনের আগে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে তীব্র সংশয় প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার। নিজে একজন প্রার্থী হিসেবে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, নির্বাচনের মাত্র ২৯ দিন বাকি থাকলেও জনগণের মধ্যে কোনো স্বস্তি নেই। মানুষ এখনো নিশ্চিত নয় নির্বাচন আদৌ হবে কি না। তুষার আরও এক ভয়াবহ শঙ্কার কথা জানান।
তিনি বলেন, বর্তমানে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের নামে অনেক ক্ষেত্রে ‘পাওয়ারফুল’ বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ধরিয়ে দেওয়া তালিকা অনুযায়ী অভিযান চালানো হচ্ছে। এতে করে নিরপরাধ বা যারা রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয়, তারা হয়রানির শিকার হচ্ছে।
অন্যদিকে, প্রকৃত সন্ত্রাসী ও দোর্দণ্ড প্রতাপশালীরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় নিজেদের নিরাপদ করে নিয়েছে। এটি নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সমান সুযোগকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে।
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান ও সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি জুলাই অভ্যুত্থানের মূল তিনটি আকাঙ্ক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন, সংস্কার এবং বিচার। তার মতে, শুধু একটি নির্বাচনই সমস্যার সমাধান নয়। তিনি জানান, আসন্ন গণভোটের মাধ্যমে সুদূরপ্রসারী কিছু সংস্কারের প্রস্তাবনা জনগণের সামনে আনা হবে।
বদিউল আলম মজুমদার সতর্ক করে বলেন, সংস্কার না হলে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের পুনরায় স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার পথ উন্মুক্ত থাকবে। সংস্কার না হওয়া মানেই আগের সেই অন্ধকার ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া। তিনি টাকার খেলা বন্ধ করা, নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জুলাই সনদে নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে বড় বড় কথা থাকলেও বাস্তব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর অনীহা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন নিলুফার চৌধুরী মনি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, দলগুলো প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কেন ৫ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী নিশ্চিত করতে পারল না? তার মতে, নারীর রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত না করে প্রকৃত সংস্কার অসম্ভব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জসীম উদ্দিন খান রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষার আমূল পরিবর্তনের দাবি জানান।
তিনি বলেন, কেবল ডিগ্রিধারী নয়, বরং দক্ষ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী গড়তে শিক্ষায় সর্বোচ্চ বরাদ্দ ও সংস্কার প্রয়োজন। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বন ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়ে স্পষ্ট অঙ্গীকার দাবি করেন তিনি।
আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, কাঠামোগত কারণে যারা সমাজে পিছিয়ে আছে, তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা ছাড়া সমান সুযোগ অর্থহীন। তিনি আদিবাসীদের উন্নয়ন ও সুরক্ষায় একটি পৃথক কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেন। অন্যদিকে, নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বিনষ্টে ‘অপতথ্য’ বা ভুল তথ্য এক বড় হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিটের উদাহরণ টেনে বলেন, অপতথ্য একটি পুরো নির্বাচনকে বিতর্কিত করতে পারে। অথচ বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এই অপতথ্য রোধে কোনো শক্তিশালী নীতিমালা বা উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান এ বিষয়ে একমত পোষণ করে বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ও মিথ্যা তথ্য রোধে একটি শক্তিশালী ‘ফ্যাক্টচেকিং সেল’ বা তথ্য যাচাই কেন্দ্র থাকা জরুরি। এছাড়া তিনি প্রার্থীদের হলফনামা যাচাই এবং নির্বাচনী ব্যয় পর্যবেক্ষণে একটি শক্তিশালী নজরদারি কমিটি গঠনের দাবি জানান।
ছাত্ররাজনীতির হারানো ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা করেন সিপিবি নেতা রাগিব আহসান মুন্না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, রাজনীতিবিদরাই নিজেদের গদি রক্ষায় ছাত্রদের অপব্যবহার করে ছাত্ররাজনীতিকে ধ্বংস করেছেন। গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য ছাত্র ও যুবসমাজের মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব তৈরি করা জরুরি।
একই সুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান বলেন, নির্বাচন মানেই গণতন্ত্র নয়। গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং শক্তিশালী বিরোধী দল। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত কার্যকর করতে হলে সংস্কারের বিকল্প নেই।
সংলাপে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা তাদের মতামত তুলে ধরেন। এতে বক্তব্য দেন, গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান, গণ অধিকার পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন, এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য নেয়ামূল বশির, বাসদ-মার্ক্সবাদীর সমন্বয়ক মাসুদ রানা, নাগরিক ঐক্যের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাকিব আনোয়ার এবং গণ অধিকার পরিষদের মুখপাত্র ফারুক হাসান।
সুজনের এই নাগরিক সংলাপ একটি পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে যে, জনগণ কেবল একটি প্রথাগত ভোট চায় না, তারা চায় আমূল সংস্কারের মাধ্যমে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। একদিকে অবৈধ অস্ত্র ও মব সন্ত্রাসের আতঙ্ক, অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ, এই দুই সংকট কাটিয়ে নির্বাচন কমিশন কীভাবে আস্থা ফেরাবে, তা-ই এখন দেখার বিষয়।
বদিউল আলম মজুমদারের ভাষায়, সংস্কারের প্রশ্নে জনগণের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ কি আগামীর আলোকিত পথে হাঁটবে, নাকি পুনরায় স্বৈরাচারের কবলে পড়বে। নির্বাচনের বাকি ২৯ দিন তাই বাংলাদেশের ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ভাগ্যনির্ধারক সময়।



