
নাজির হোসেন,সিলেট | বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | ৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, বিরোধী দল হিসেবে আমরা খুব ছোট নই। যদি আমরা আমাদের দায়িত্ববোধ থেকে ঠিকমতো দায়িত্ব পালনন করতে পারি, তাহলে ইনশাআল্লাহ বিরোধী দলে থেকেও সরকারি দলের স্টিয়ারিং ঠিক করে দিতে পারবো। আর যদি দেখি পারছি না, তাহলে ওই দুষ্ট গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে গিয়ে বলবো- স্টপ হেয়ার। ডোন্ট ক্রস ইওর লিমিট। তোমাদেরকে আর সামনে এগোতে দেওয়া যাবে না। জীবন তো একটাই। লড়াই করে জাতীর জন্য, মানবতার জন্য দ্বীনের জন্য জান দিতে রাজী।
তিনি মঙ্গলবার (২ জুন) বিকেল ৫টায় সিলেট মহানগর জামায়াত আয়োজিত নগরীর শাহী ঈদগাহস্থ জেলা শিল্পকলা একাডেমী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপরোক্ত কথা বলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের সমালোচন করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো সেনসেটিভ জায়গায়, যেটাকে অর্থনীতির হার্ট বলা হয়, সেখানে এমন এক ব্যক্তিকে গভর্নর হিসেবে বসানো হয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে কেনো, বিশ্বের ইতিহাসেও এরকম কোন দুর্বল ব্যক্তিকে সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্ণর করা হয়েছে, এমন কোন নজির নাই। তিনি একজন ঋণ খেলাপি। তিনমাস আগে ২% পার্সেন্ট দিয়ে তিনি ঋণখেলাপির দায় থেকে মুক্তি পেয়েছেন। তিনি একটা গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির মালিক। একটা গার্মেন্টস যিনি ঠিক মতো চালাতে পারছেন না, তিনি আবার ব্যাংলাদেশ চালিয়ে দেবেন- হাস্যকর। তাকে কেন এখানে আনা হয়েছে? তিনি যেহেতু দলকানা, তাই তাকে এখানে আনা হয়েছে।
সরকার ইসলাামী ব্যাংক দখলের চেষ্টা করছে অভিযোগ করে শফিকুর রহমান বলেন, দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে টাকা পাওয়া যাচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ৫টি ব্যাংক নিয়ে সমন্বিত ব্যাংক হয়েছিল সেই ব্যাংকের গ্রাহকরা টাকার জন্য ঘুরছে সমাধানের উদ্যোগ নেই। সরকার সমৃদ্ধ ইসলামী ব্যাংক দখলে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাতের অন্ধকারে জুম মিটিং করে ইসলামী ব্যাংক দখলের বন্দোবস্ত হচ্ছে হচ্ছে।
তিনি বলেন, পলাতক, ফ্যাসিস্ট ও লুটপাটকারী বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্ণরকে জোর জবরদস্তি করে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারে বসানোর ফলাফল ভালো হবে না। যে গ্রাহকের ৫টি শেয়ার আছে, সেও ইসলামী ব্যাংকের একজন মালিক। সুতরাং একটি সমৃদ্ধ ব্যাংক দখল হয়ে যাবে গ্রাহকরা বসে থাকবে না। এজন্য গ্রাহক হিসেবে আমাকেও রাজপথে নামতে হতে পারে।
শফিকুর রহমান আরও বলেন, শিশু ধর্ষণ ও হত্যা, খুন, চুরি-ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। আর সরকার ব্যস্ত রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন স্তরে দলকানাদের বসাতে। তারা জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে জাতির সাথে প্রতারণা করেছে। প্রায় ৭০ শতাংশ গণভোট ‘হ্যা’ দাতাদের অপমান করে তারা ফ্যাসিবাদের পথেই হাঁটছে।
এতে জনগণ বিক্ষুব্ধ হচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এর ফল সরকারকেই বহন করতে হবে। স্বৈরাচারী কায়দায় দেশ শাসনের ইচ্ছা থাকলে পরিনতির জন্যও ভাবতে হবে। জুলাই বার বার ফিরে আসবে। আমরা আর কোন মুল্যবান জীবন হারাতে চাই না।
এক মাসের মাথায় আবারও জ্বালানি তেলের দামও বাড়ানোর সমালোচনা করে বিরোধী দলের এই শীর্ষ নেতা বলেন, দাম রাড়ানো হয়েছে রাতের আধারে। এটাও কি রাতের সরকার। এমন প্রশ্ন জনগণ করতে পারে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগরী আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং মহানগর সেক্রেটারী মোহাম্মদ শাহজাহান আলীর পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার-মিডিয়া সেক্রেটারী অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও জেলা আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান।
বক্তব্য রাখেন ও উপস্থিত ছিলেন-সিলেট অঞ্চল টীম সদস্য হাফিজ আব্দুল হাই হারুন, মহানগর নায়েবে আমীর হাফিজ মাওলানা মিফতাহুদ্দীন ও ড. নুরুল ইসলাম বাবুল, জেলা নায়েবে আমীর অধ্যাপক আব্দুল হান্নান, জেলা সেক্রেটারী জয়নাল আবেদীন, মহানগর সহকারী সেক্রেটারী এডভোকেট মোহাম্মদ আব্দুর রব, জাহেদুর রহমান চৌধুরী ও মাওলানা ইসলাম উদ্দিন, বাংলাদেশ লইয়ার্স কাউন্সিল সিলেটের সভাপতি এডভোকে আলিম উদ্দিন, মহানগর শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি এডভোকেট জামিল আহমদ রাজু ও মহানগর ছাত্রশিবিরের সভাপতি শহীদুল ইসলাম সাজু প্রমুখ। শুরুতেই পবিত্র কুরআন থেকে তেলাওয়াত করেন মাওলানা মাহমুদুর রহমান দিলাওয়ার।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমীর আরও বলেন, ভোটের আগে তারা গণভোটে হ্যা’এর পক্ষে প্রচারণা চালালেন। এখন বলেন নির্বাচন যদি না দেয়, সেই ভাবনা থেকে গণভোট মেনে নিয়েছিলাম। এটি জনগণের সাথে সুষ্পষ্ট প্রতারণা। তারা ইতোমধ্যে প্রতারণার ফলাফল পেতে শুরু করেছেন। একটি সরকারের ৩ মাসের মাথায় মন্ত্রীদেরকে ভুয় ভুয়া স্লোগান শুনতে হচ্ছে। অথচ আমরা মনে কষ্ট নিয়েও নির্বাচনী ফলাফল মেনে নিয়েছিলাম। আবার সরকারের জ্ঞানী মন্ত্রীরা বলেন সংবিধানে গণভোট নাই। গণভোট না কি অবৈধ। তাইলে শহীদ জিয়া কিভাবে গণভোট করেছিলেন, এর উত্তর তাদের কাছে নেই। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যে আদেশে জাতীয় নির্বাচন হলো সেই একই আদেশে গণভোট হলো। তাহলে একটা বৈধ আর একটা অবৈধ হয় কিভাবে। এটা প্রায় ৭০ শতাংশ জনগণকে অপমানের শামিল।
জনগণকে যারা অপমান করে তাদেরকে জনগণও ছেড়ে দেয় না মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমরা মনে কষ্ট নিয়েও জাতীয় স্বার্থে নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেয়েছিলাম। কিন্তু আর কোন ছাড় দেবো না। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংসদের ভেতরে ও বাইরে লড়াই চালিয়ে যাবো। লড়াই থামবে না।
তিনি বলেন, সরকার ভালো করলে সহযোগিতা করবো, মন্দ করলে প্রতিবাদ করবো, বাধাঁ দিবো। নিরব বসে থাকবো না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, সিটি কর্পোরেশ ও জেলা প্রশাসকের চেয়ারে দলকানাদের বসিয়ে তারা ফ্যাসিবাদের পথে হাটঁছেন। ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলে পতনের ছিদ্র কিন্তু খোলা থাকবেই। জুলাই থেকে শিক্ষা না নিলে এটা দুর্ভাগ্য। আমরা সংসদে গালাগালি ও কারও চরিত্র হরণ করতে বাধা দিয়েছি। সংসদে আর গান বাজনা হয়না। রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের জন্য সরকারকেই কার্যকর ভুমিকা পালন করতে হবে। মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সুধী সমাজকে জামায়াতের যোগদানের আহ্বান জানান তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার-মিডিয়া সেক্রেটারী অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, জুলাই শহীদ ও আহতদের আকাঙ্খা পূরণে জামায়াতে ইসলামী কাজ চালিয়ে যাবে। সরকারকে নব্য ফ্যাসিবাদের পথ থেকে সরে আসতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে রাজপথে নামতে বাধ্য হবে। জামায়াত জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংসদে ও রাজপথে থাকবে।
সভাপতির বক্তব্যে সিলেট মহানগর আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, জামায়াতে ইসলামী একটি মজলুম দল। জামায়াতকে নিশ্চিহ্ন করতে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু আমরা আছি আর ষড়যন্ত্রকারীরা পরাজিত হয়েছে, পালিয়ে গেছে। তাই এদেশে কারো উপর কোন জুলুম মেনে নিবে না। ব্যাংক থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দখলের সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে।
