নূর মুহাম্মদ রাহমানী | রবিবার, ২৩ নভেম্বর ২০২৫ | প্রিন্ট | ১০ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

সমাজে বিধবা নারীরা একরকম উপেক্ষিত। তাদের জীবন হয় অত্যন্ত মানবেতর। শুধু বিধবা হওয়ার কারণে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি তাদের হতে হয় যা বর্ণনা করা কঠিন। হিন্দু সম্প্রদায়ের সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত হলেও এখনও রয়েছে নানাবিধ কুসংস্কার, যা একজন বিধবাকে নিগৃহীত করে এবং স্বাভাবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। আক্ষেপের বিষয় হচ্ছে, এখন মুসলিম সমাজেও বিধবা নারীদের অলিখিতভাবে অপয়া মনে করা হয়। ফলে বিধবা পরবর্তী জীবন আর স্বাভাবিক হয়ে ওঠে না। মূলত ধর্মকে না বোঝার কারণে এমনটি হয়ে থাকে। সত্যিকার অর্থে বিধবাদের সঙ্গে জড়িত প্রাচীন সব কুসংস্কারকে উপড়ে ফেলে সত্যিকারের সম্মান-মর্যাদা এবং অধিকার নিশ্চিত করেছে ইসলাম।
বিধবা নারীর অধিকার : এতিম বাচ্চার দেখাশোনা বা এ ধরনের কোনো শরিয়তসম্মত অপারগতা না থাকলে বিধবা নারীদের ইদ্দতের পরে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হওয়াকে দোষ মনে করা ঠিক নয়। আর বিধবাদের বিয়ে বসতে বাধা দেওয়াকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। নবীজির (সা.)-এর সম্মানিত স্ত্রীগণও হজরত আয়েশা (রা.) ব্যতীত কেউই কুমারী ছিলেন না, বরং কেউ বিধবা ছিলেন, কেউ তালাকপ্রাপ্ত ছিলেন (তাকমিলায়ে ফাতহুল মুলহিম : ১/৯৭)। সাহাবায়ে কেরামও বিধবা নারীদের বিয়ে করেছেন। তাই এমন মোবারক আমলকে দোষ মনে করা চরম অজ্ঞতা এবং ভ্রষ্টতা। আর কুমারী নারীর চেয়ে বিধবা নারীর বিয়ে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তার বিয়ে না হলে অনেক সময়ই শারীরিক সুস্থতা, ইজ্জত, কখনো দ্বীন ধর্ম এমনকি সবকিছুই বরবাদ হয়ে যায়। (তাফসিরে ইবনে কাসির : ৩/২৮৭; তাফসিরে তাবারি : ১৮/১২৫)
বিধবা বিয়ের বিধান : বিধবা হওয়ার পর নারীকে সামাজিক মর্যাদা এবং নিরাপত্তার জন্য ফের বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই, যা ইসলাম অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করেছে। পবিত্র কুরআনের বেশ কয়েক জায়গায় বিধবা নারীদের ইদ্দতের পরে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হতে উৎসাহিত করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা স্ত্রী রেখে মৃত্যুবরণ করবে, তাদের স্ত্রীদের কর্তব্য হলো চার মাস দশ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করা। এরপর যখন ইদ্দত পূর্ণ করে নেবে তখন তারা নিজেদের ব্যাপারে বিধিমতো ব্যবস্থা নিলে তাতে কোনো পাপ নেই’ (সুরা বাকারা : ২৩৪)। আয়াতটির মধ্যে বিধবা নারীর ইদ্দত পালনের অধিকার প্রসঙ্গেও আলোচনা করা হয়েছে।
সম্পদের অধিকার : বিধবা নারীর সর্বপ্রধান অধিকার হলো মৃত স্বামীর উত্তরাধিকার লাভ। যেখানে নারীরা কোনো সম্পত্তিরই মালিক হতে পারত না বরং নিজেরাই পণ্য হিসেবে বিক্রীত হতো সেখানে স্বামীর মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে বিধবা স্ত্রীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে ইসলাম। কোনো সন্তান থাকলে স্ত্রী এক অষ্টমাংশ এবং না থাকলে এক-চতুর্থাংশ সম্পত্তির মালিক হবেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের সন্তান না থাকলে তাদের (স্ত্রীদের) জন্য তোমাদের পরিত্যক্ত সম্পদের এক-চতুর্থাংশ, তোমাদের সন্তান থাকলে তাদের জন্য তোমাদের পরিত্যক্ত সম্পদের এক-অষ্টমাংশ। তোমরা যে অসিয়ত করবে তা দেওয়ার পর এবং ঋণ পরিশোধের পর’ (সুরা নিসা : ১২)। বিধবা স্ত্রী সন্তানহীন হলে অথবা অন্যত্র বিয়ে করলেও সে মৃত স্বামীর সম্পদের উত্তরাধিকারী হবে, যদিও বিষয়টি নিয়ে সমাজে কুসংস্কার রয়েছে। আর দেনমোহরও বিধবা নারীর অধিকার। স্বামী দেনমোহর পরিশোধ না করে মারা গেলে স্বামীর পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে অন্যান্য ঋণের মতো আগে দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে। তারপর বাকি সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।
বিধবা নারীর সহযোগিতা : বিধবার প্রতি সযত্ন এবং তাদের অধিকারের বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! নারীদের জোরপূর্বক উত্তরাধিকারের পণ্য হিসেবে গ্রহণ করা তোমাদের জন্য বৈধ নয় এবং তোমরা তাদের যা প্রদান করেছ তার কোনো অংশ তাদের কাছ থেকে নিয়ে নেওয়ার জন্য তাদের আটকে রেখো না; যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা ব্যভিচারে লিপ্ত হয় তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো, এমনকি তোমরা যদি তাদের পছন্দ নাও করো। এমনও তো হতে পারে যা তোমরা অপছন্দ করো, তাতেই আল্লাহ অনেক কল্যাণ নিহিত রেখেছেন’ (সুরা নিসা : ১৯)। বিধবা নারীর দায়-দায়িত্ব পালন করা, তাদের সহযোগিতা করা, তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা, সহানুভূতি প্রদর্শন করা অনেক বড় পুণ্যের কাজ। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, নবী (সা.) বলেছেন, ‘বিধবা ও মিসকিনের জন্য খাদ্য জোগাড়ে চেষ্টারত ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর মতো অথবা রাতে সালাতে দণ্ডায়মান ও দিনে সিয়ামকারীর মতো’ (বুখারি : ৫৩৫৩)। বিধবা নারীদের বিয়ে করার মাধ্যমেও তাদের সহযোগিতা করা যেতে পারে। চারটা পর্যন্ত বিয়ে করার যেহেতু শরিয়ত অনুমতি দিয়েছে, এজন্য সবদিক ঠিক থাকলে বিধবা নারীকে বিয়ে করে তাদের সহযোগিতা করা যেতে পারে। বিধবা নারীকে বিয়ে করলে নিজে গুনাহ থেকেও বাঁচা যাবে এবং একজন বিধবা নারীকে সহযোগিতা করার পুণ্য অর্জন করা যাবে।
বিধবা নারীর পুরস্কার : রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমি ও (নিজের যত্ন না নেওয়ায়) চেহারায় দাগ পড়া নারী পরকালে এভাবে থাকব অথবা শাহাদাত ও মধ্যমা আঙুলের চেয়ে বেশি দূরত্ব থাকবে আমাদের মধ্যে। সে হলো সেই নারী যার স্বামী মারা গেছে এবং তার বংশীয় মর্যাদা ও সৌন্দর্য থাকার পরও সে নিজেকে বিরত রাখে এতিম সন্তানদের জন্য, যতক্ষণ না সন্তানরা (স্বাবলম্বী হয়ে) পৃথক হয়ে যায় অথবা মারা যায়। (আবু দাউদ : ৫২৪৯)
বিধবার সন্তানের দায়িত্ব : সন্তানের দায়িত্ব শুধু বিধবা নারীর নয়। ইসলাম বিধবা নারীকে সন্তানের একক দায় থেকে মুক্তি দিয়েছে। শরিয়ত মতে, সম্পদ ও ব্যয় নির্বাহের ক্ষেত্রে পিতার অবর্তমানে দাদা সন্তানের অভিভাবক এবং তার অবর্তমানে ইসলামি রাষ্ট্রের বিচারক অভিভাবক নির্ধারণ করে দেবে। অবশ্য মা সন্তান প্রতিপালন করবে যতক্ষণ না সে অন্যত্র বিয়ে করে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তুমি সন্তানের ব্যাপারে বেশি হকদার যতক্ষণ না তুমি বিয়ে করো’ (আবু দাউদ : ২২৭৬)। সন্তান প্রতিপালনের অজুহাতে মায়ের জীবন ক্ষতিগ্রস্ত করার সুযোগ নেই। মহান আল্লাহ বলেন, ‘কোনো মাকে তার সন্তানের জন্য এবং কোনো পিতাকে তার সন্তানের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে না (সুরা বাকারা : ২৩৩)। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে বিধবাসহ সমাজের সব শ্রেণির অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তওফিক দান করুন।



