বুধবার ১৫ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা !

এস লুপিন,ঢাকা   |   রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৫৮ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা !

বাংলাদেশে নারী নিরাপত্তা একটি গুরুতর সামাজিক সংকট হিসেবে ক্রমেই উন্মোচিত হচ্ছে। সম্প্রতি মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও ইউএন উইমেনের যৌথ জরিপে প্রকাশিত হয়েছে যে, দেশের প্রায় ৮৭ শতাংশ নারী কোনো না কোনো ভাবে গণপরিবহনে হয়রানির শিকার হন। এদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ নারী স্পষ্টভাবে যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। গণপরিবহন মানেই অনেক নারীর জন্য দৈনন্দিন লড়াই যেখানে নিরাপদ চলাচলের মৌলিক অধিকার প্রায়শই ভেঙে পড়ে।

গণপরিবহনে ঘটে যাওয়া হয়রানি শুধু মানসিক বা শারীরিক আঘাতের বিষয় নয়, এটি নারীর স্বাধীনতা ও মর্যাদার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। প্রতিদিন শহরের ব্যস্ত রুটে, বাস, ট্রেন, রিকশা এবং এমনকি অটোরিকশাতেও, নারীরা নানা ধরনের হয়রানির মুখোমুখি হন। এটি হতে পারে অশ্লীল মন্তব্য, অনাবশ্যক স্পর্শ, অশোভন অঙ্গভঙ্গি বা মানসিক ভয় প্রদর্শন। এমন পরিস্থিতি নারীর চলাচল সীমিত করে এবং প্রায়শই তাদের শিক্ষাজীবন, কর্মসংস্থান বা সামাজিক অংশগ্রহণেও প্রভাব ফেলে।

আইনের দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি কোনো সাধারণ অসভ্যতা নয়। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ধারা ৩৫৪ অনুযায়ী, কোনো নারীকে আক্রমণ করা, জোর করে স্পর্শ করা বা তার শালীনতা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে বলপ্রয়োগ করা হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। একইভাবে, ধারা ৫০৯ অনুসারে কোনো নারীকে অপমান বা শ্লীলতাহানি করার উদ্দেশ্যে শব্দ, অঙ্গভঙ্গি বা আচরণ করাও দণ্ডনীয় অপরাধ। আরও গুরুত্বপূর্ণ, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর অধীনে এসব অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে এই আইন কার্যকর করার মাধ্যমে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

তবে বাস্তবতায় দেখা যায়, আইন থাকলেও তা যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে না। অনেক নারী হয়রানি পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় ভয়, লজ্জা বা সামাজিক দমনের কারণে এগোতে পারেন না। এমনকি অনেক সময় পুলিশি সহায়তা পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। এজন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত নীতি; যা শুধু শাস্তি নয়, বরং প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপও অন্তর্ভুক্ত করবে। শিক্ষার মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি, গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক পদক্ষেপ অপরিহার্য।

নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত করতে প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, নারী যাত্রীদের জন্য আলাদা সিটিং ব্যবস্থা, হেল্পলাইন, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং জরুরি বাটন স্থাপন করা যেতে পারে। এ ছাড়া যাত্রী এবং চালক উভয়ের জন্য নিয়মিত সচেতনতা ও প্রশিক্ষণও অপরিহার্য। সামাজিক সংস্থা, এনজিও এবং সরকারি সংস্থাগুলো একত্রিত হয়ে বিষয়টি কার্যকর করতে পারে।

শহরের রাস্তায় নারীর নিরাপত্তা নিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তন প্রয়োজন। ‘নারীকে দেখে হাসা বা অশ্লীল মন্তব্য করা’ বা ‘চুপচাপ থাকাই ভালো’—এ ধরনের মানসিকতাকে বাদ দিয়ে নারীর স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। পরিবার, শিক্ষক, বন্ধু এবং সহকর্মী সবার দায়িত্ব রয়েছে নারীর নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে।

এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও নারী শিক্ষার্থীদের সচেতন ও আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। এতে নারীরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে গণপরিবহনে নিরাপদভাবে চলাচল করতে পারবেন। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, কমিউনিটি লিডার এবং নাগরিক সমাজ একত্রিত হয়ে ‘নিরাপদ যাতায়াত’ নিয়ে প্রকল্প শুরু করলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

সামাজিক আচরণ পরিবর্তনের পাশাপাশি, নারীর প্রতি সহমর্মিতা ও সমর্থন নিশ্চিত করাও জরুরি। কেউ যদি হয়রানির শিকার হন, তাদের কানে অভিযোগ পৌঁছানো সহজ হওয়া দরকার। যাত্রী, পরিদর্শক এবং চালক সবাই সচেতন হলে নারীর চলাচল অনেক বেশি নিরাপদ হবে।

নিরাপদ গণপরিবহন শুধু আইন বা প্রযুক্তি দিয়ে সম্ভব নয়। এটি সমাজের মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ওপরও নির্ভর করে। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে আমাদের সমাজের উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। নারী যাতে স্বাচ্ছন্দ্য এবং স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারে, তার জন্য প্রয়োজন কার্যকর আইন, সচেতন সমাজ এবং সুষ্ঠু প্রশাসনিক ব্যবস্থা।

প্রতিটি নারী যাত্রাপথেই নিরাপদ হতে চাই—কোনো ভয়, আতঙ্ক বা হয়রানির ছায়া ছাড়াই। গণপরিবহন মানেই স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং মৌলিক অধিকার। সমাজ এবং সরকার একত্রে কাজ করলে এই অধিকার সব নারীর জন্য নিশ্চিত করা সম্ভব। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে আমাদের সমাজকে আরও মানবিক, ন্যায়সংগত এবং সমৃদ্ধশালী করা। এটি শুধু নারীর জন্য নয়, সমগ্র সমাজের জন্য একটি জ্যোতির্ময় ভবিষ্যৎ রচনা করবে।

Facebook Comments Box
আরও
Chief Editor
Shahan Ahmed Chowdhury
Editor
J U Sumon
News Editor
Mehdi Hassan
UK Office
USA OFFICE
  • Hasan Hafizur Rahman
    264/A,Central Avenue
    Garden City
    NY 11040
    USA
সিলেট ব্যুরো
  • আব্দুর মুক্তাদির
    সিটি কর্পোরেশন মার্কেট (২য় তলা)
    চালিবন্দর, সোবহানীঘাট, সিলেট।
ঢাকা ব্যুরো
  • সৈয়দ আবু নাসের
    এমএস প্লাজা ২৮/সি/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০