বুধবার ১৫ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৮১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা

দেশে বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া পরিশোধে চরম অনীহা

ঢাকা ব্যুরো   |   রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৭ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

দেশে বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া পরিশোধে চরম অনীহা

দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি এবং ভর্তুকি কমাতে বারবার দাম বাড়ানো হলেও খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই বিল পরিশোধে চরম অনীহা দেখাচ্ছে। ঢাকার দুই প্রধান বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা- ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) এবং ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) তথ্য অনুযায়ী, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাছে বকেয়া বিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৮১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই হিসাব ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। বর্তমান সময় (মার্চ ২০২৬) পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য পাওয়া গেলে এই অনাদায়ী বিলের পরিমাণ সহজেই হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

পাওনার খতিয়ান- ডিপিডিসি ও ডেসকো : অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, ডিপিডিসি সরকারের কাছে পায় ৬৮৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। অন্যদিকে ডেসকোর পাওনা ১৯৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। বিস্ময়কর বিষয় হলো, বিদ্যুৎ খাতের অভিভাবক সংস্থা ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়’-এর কাছেই বকেয়া রয়েছে ১৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। বকেয়া বিলের প্রধান খাতগুলো হলো- স্থানীয় সরকার বিভাগ (সিটি কর্পোরেশন ও ওয়াসা): সর্বোচ্চ বকেয়া এই খাতে, যার পরিমাণ প্রায় ৪২৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ঢাকা ওয়াসার দেনা ১৮২ কোটি টাকা এবং ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সম্মিলিত দেনা ১২৩ কোটি টাকার বেশি। জেনেভা (বিহারী) ক্যাম্প: মোহাম্মদপুর ও মিরপুরের বিহারী ক্যাম্পগুলোতে ব্যবহূত বিদ্যুৎ বিল বাবদ বকেয়া ২৬৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এই বিপুল অঙ্কের দায় নিতে সরাসরি অস্বীকার করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। অন্যান্য মন্ত্রণালয়: গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দেনা ৯০ কোটি ৫১ লাখ টাকা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৩৭ কোটি ৭৮ লাখ এবং স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের বকেয়া ২৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির কাছেও বকেয়া রয়েছে ২৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।

সাধারণ বনাম সরকারি, আইনের দ্বিমুখী আচরণ : সাধারণ গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ডিপিডিসি ও ডেসকোর আচরণ কঠোর। মাত্র তিন-চার মাসের বিল বকেয়া পড়লেই সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ অভিযান চালানো হয়, এমনকি মামলাও দেয়া হয়। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই তোড়জোড় কেবল ‘চিঠি চালাচালি’র মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সাধারণ গ্রাহক লোডশেডিং সহ্য করেও নিয়মিত বিল দেয়। অথচ সরকারি অফিসগুলোতে এসি, লাইট, লিফট চললেও তারা বিল পরিশোধে দায়বদ্ধ নয়। আমরা ক্যাবের পক্ষ থেকে মামলা করে এই টাকা আদায়ের জন্য কাগজপত্র চেয়েছিলাম, কিন্তু ডিপিডিসি ও ডেসকো কোনো তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেনি।

সাদা হাতি বিহারী ক্যাম্প, দায় নিতে নারাজ মন্ত্রণালয় : ঢাকার মোহাম্মদপুর ও মিরপুর বিহারী ক্যাম্পের বিল নিয়ে এক অদ্ভুত অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, এই ক্যাম্পগুলো তাদের শরণার্থী কর্মসূচির আওতাধীন নয়। ফলে ২৬৩ কোটি টাকার বেশি এই বকেয়া বিলের বোঝা এখন বিতরণকারী সংস্থাগুলোর নিট মুনাফাকে গ্রাস করছে। ডিপিডিসির ক্ষেত্রে এই বকেয়া তাদের নিট মুনাফার ৪১১ শতাংশের সমান।

নেই স্মার্ট মিটারের বালাই : সিস্টেম লস ও বকেয়া কমাতে সাধারণ গ্রাহকদের ঘরে জোর করে স্মার্ট প্রিপেইড মিটার লাগানো হলেও সরকারি দপ্তরগুলোকে এই আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে মন্ত্রণালয়গুলো বাজেটে বিদ্যুৎ বিলের জন্য বরাদ্দ থাকলেও তা অন্য খাতে খরচ করছে অথবা পরিশোধে অনীহা দেখাচ্ছে।

সর্বোপরি, বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি কমাতে সরকার ২০২৩ সাল থেকে কয়েক দফা বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সাধারণ মানুষের ওপর দামের বোঝা না চাপিয়ে যদি নির্বাহী বিভাগের এই ৮৮১ কোটি টাকা আদায় করা যেত, তবে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর আর্থিক ভিত্তি অনেক মজবুত হতো। সরকারের নিজের ঘরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা না করে সাধারণ গ্রাহকের ওপর দায় চাপানোকে ‘সমন্বয়হীনতা ও অন্যায্য’ বলে অভিহিত করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিদ্যুৎ বিলের এই পাহাড় কতদিনে নামবে, নাকি দিনশেষে সাধারণ গ্রাহকের ইউনিট প্রতি মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমেই এই ঘাটতি পূরণ করা হবে সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Facebook Comments Box
আরও
Chief Editor
Shahan Ahmed Chowdhury
Editor
J U Sumon
News Editor
Mehdi Hassan
UK Office
USA OFFICE
  • Hasan Hafizur Rahman
    264/A,Central Avenue
    Garden City
    NY 11040
    USA
সিলেট ব্যুরো
  • আব্দুর মুক্তাদির
    সিটি কর্পোরেশন মার্কেট (২য় তলা)
    চালিবন্দর, সোবহানীঘাট, সিলেট।
ঢাকা ব্যুরো
  • সৈয়দ আবু নাসের
    এমএস প্লাজা ২৮/সি/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০