আবুল হোসেন,হবিগঞ্জ | বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬ | প্রিন্ট | ৫ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

হবিগঞ্জ শহরে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযানে উদ্ধার হওয়া কয়েক কোটি টাকা মূল্যের একটি সরকারি জলাশয় আবারও ভরাটের অনুমতি দেওয়ার ঘটনায় তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ মাত্র আড়াই লাখ টাকায় ১০ বছরের জন্য জায়গাটি ইজারা দেওয়ায় শহরে জলাবদ্ধতা আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
জানা গেছে, গত ৩০ জুলাই হবিগঞ্জ সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন বাইপাস সড়কের পাশে অবস্থিত ৪.০৪ শতক সরকারি জলাশয় ভরাট করে রাস্তা নির্মাণের জন্য প্রবাসী সুনীল বণিককে ১০ বছরের জন্য ইজারা দেন। চুক্তি অনুযায়ী এই ইজারার ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৭৪ হাজার টাকা।
এর আগে ২০২৪ সালে একই জলাশয় ভরাট করে সেখানে বৃক্ষরোপণ করেছিলেন সুনীল বণিক। বিষয়টি নিয়ে শহরে সমালোচনা শুরু হলে জেলা প্রশাসনের অনুমতিতে পরিবেশ অধিদপ্তর উচ্ছেদ অভিযান চালায়। সে সময় ভরাট করা মাটি সরিয়ে ফেলা এবং লাগানো গাছ কেটে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু, সেই ঘটনার পরও আবার একই জায়গা ভরাটের অনুমতি দেওয়ায় সরকারের এক দপ্তরের পদক্ষেপ অন্য দপ্তরের মাধ্যমে কার্যত অকার্যকর হয়ে যাওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাইপাস সড়কের পাশের জলাশয় ভরাট করে প্রায় ২২ ফুট প্রশস্ত দুটি রাস্তা নির্মাণ করছেন সুনীল বণিক। জলাশয়ের তিনদিকে রাস্তা এবং একদিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি বাণিজ্যিক টিনশেড রয়েছে। মাঝখানে থাকা পুকুর আকৃতির অংশটিও ভরাটের প্রস্তুতি চলছে। যদিও চুক্তিপত্রে আবাসিক এলাকার প্রবেশপথ নির্মাণের কথা বলা হয়েছে, বাস্তবে সেখানে সাধারণ মানুষের চলাচলের সুযোগ নেই। বরং প্রবেশ ঠেকাতে দেওয়া হয়েছে কাঁটাতারের বেড়া।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, এই জলাশয়টি বৃষ্টির পানি ধারণ করে। তবুও বর্ষা মৌসুমে এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়। এটি ভরাট হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।
স্থানীয়দের দাবি, বাইপাস সড়ক এলাকায় প্রতি শতক জমির বাজারমূল্য অন্তত ২০ লাখ টাকা। সে হিসেবে চার শতক জমির দাম প্রায় এক কোটি টাকার কাছাকাছি। সেখানে মাত্র আড়াই লাখ টাকায় সরকারি জলাশয় ইজারা দেওয়ার বিষয়টি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) হবিগঞ্জের সহসভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী মমিন বলেন, কয়েক ঘণ্টা বৃষ্টি হলেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। কোথাও কোথাও নৌকাও চলতে দেখা যায়। এমন পরিস্থিতিতে জলাশয় ভরাট হলে দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, বাইপাস ও গার্নিং পার্ক এলাকায় ঘনবসতি রয়েছে। সেখানে অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটলে আগুন নেভানোর জন্য পর্যাপ্ত পানির প্রয়োজন হবে। জলাশয় ভরাট হয়ে গেলে সেই পানিও পাওয়া যাবে না।
হবিগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রথমবার জায়গাটি ভরাটের কারণে শহরের পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি হয়েছিল। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে অভিযান চালিয়ে জায়গাটি উদ্ধার করা হয় এবং ভরাট করা মাটি সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। দ্বিতীয়বার ভরাটের অনুমতির বিষয়টি তাদের জানা নেই বলে জানান তিনি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) হবিগঞ্জের সহসভাপতি মো. বাহারউদ্দিন বলেন, শহরবাসীকে জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে ফেলে কোটি টাকার সরকারি জলাশয় মাত্র আড়াই লাখ টাকায় ইজারা দেওয়ার বিষয়টি গভীর সন্দেহের সৃষ্টি করে। বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে তদন্ত করা উচিত।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন বলেন, কেন্দ্রীয় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর নির্দেশেই তিনি এই ইজারা দিতে বাধ্য হয়েছেন। এখানে তার ব্যক্তিগত কোনো ভূমিকা ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।
হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীনের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও, তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।



