জামাল উদ্দিন বারী | বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | প্রিন্ট | ১২৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

ওসমান হাদি দেশে ইনসাফ ও নতুন ধারার রাজনীতি কায়েম করতে চেয়েছিলেন। জুলাই অভ্যুত্থান তাঁকে সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার মোড়ল ডেমাগগরা নিজেদের ভয়-শঙ্কা লুকিয়ে এক প্রকার তাচ্ছিল্যের সুরে তাঁর প্রতি কটাক্ষপূর্ণ প্রশ্নবাণ ছুঁড়ে বলেছিলেন, তুমি কে হে, আমাদের সাথে লড়তে আসো? তোমার রাজনীতির কি অভিজ্ঞতা আছে? তুমি কোনো ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হতে পারবে না। প্রতিত্তোরে ওসমান হাদি স্বভাবসুলভ হাসিতে তাদের প্রতি পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেননি। তিনি বলেছেন, আমি ৫০০ ভোট পেলেও খুশি, আমি রাজনীতির গতানুগতিক ধারা বদলে দিতে চাই। যেখানে নির্বাচন করতে কোটি কোটি টাকার প্রয়োজন হয়না, চাঁদাবাজি করতে হয়না, পেশিশক্তির সবাবেশ ঘটাতে হয়না। জনগণের দোরগোড়ায় গিয়ে তাদের মনের কথাটি শোনা এবং তাদের প্রত্যাশা ও চাহিদাগুলোকে আত্মস্থ করা অত:পর সত্যিকারের জনপ্রতিনিধি হয়ে জাতীয় সংসদে গিয়ে যথাযথ ভূমিকা পালন করা, এটাই হচ্ছে হাদির রাজনীতির প্রাথমিক লক্ষ্য।
সেই লক্ষ্য অর্জনকে তিনি খেলো মনে করেননি। এটি অনেক বড় চ্যালেঞ্জ ও পদে পদে বাঁধা ও প্রতিবন্ধকতার বিষয়গুলোকে বুঝে-শুনেই তিনি সেই বন্ধুর পথ অতিক্রমের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন। সেই পথে তার প্রাপ্তিযোগ ছিল প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি। ঢাকা-৮ নির্বাচনী আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে গণসংযোগ শুরু করে তিনি নিজের অভিজ্ঞতায় যেসব বিষয় উপলব্ধি করেছিলেন, তা অকপটে তুলে ধরেছিলেন। সেই সাথে সাধারণ মানুষের মধ্যে গতানুগতিক রাজনীতির ধারা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের পথে এক নিবিড় পরিবর্তনের শুভ সূচনা দেখতে পেয়েছিলেন। যেখানে নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে প্রথম ১০ দিনে পনেরো লাখ টাকা তাঁর নির্বাচনী ফান্ডে জমা হয়েছিল। কোনো ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, কোনো কর্পোরেট কোম্পানি বা অলিগার্ক তাঁর ফান্ডে কোনো টাকা দিতে যায়নি। জনসংযোগ করতে গেলে শিক্ষার্থী তরুণ-তরুণী, গৃহবধু, মধ্যবিত্ত গৃহকর্তা, সাম্যন্য বেতনের চাকুরে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ইত্যাদি বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ ২০ টাকা থেকে একশ’-দুইশ’, পাঁচ-দশ হাজার টাকা দিয়ে হাদির প্রতি তাদের সমর্থন ও শুভ কামনা প্রকাশ করেছেন। ইনকিলাব মঞ্চ, ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারসহ তার নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে প্রতিদিনের নির্বাচনী খরচ, অর্থের উৎস দক্ষ করনিকের মত তিনি পাই পাই হিসাব স্বচ্ছতার সাথে জনসম্মুখে তুলে ধরার এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছেন। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অধ:পতন, ভ্রষ্ট সামাজিক মূল্যবোধ, নষ্ট ও দুবৃর্ত্তায়িত রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার তাগিদ শোনা যাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু এটি শুরু করবে কে, কখন কোথা থেকে শুরু হবে এমন সব প্রশ্ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনুঘটক কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। মূলত ইতিবাচক পরিবর্তন প্রত্যাশী প্রতিটি মানুষকে নিজের মধ্য থেকেই পরিবর্তনের সূচনা ঘটাতে হবে। নাগরিক হিসেবে, কর্মী হিসেবে, নেতা হিসেবে নিজের দায়-দায়িত্ব যথাযথ স্বচ্ছ ও সৎভাবে পালন করার মধ্য দিয়েই সেই পরিবর্তন আনতে হবে। একজন বিপ্লবী, সংস্কৃতি কর্মী ও রাজনৈতিক জনপ্রতিনিধি হিসেবে ওসমান হাদি নিজের মধ্যে সেই পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে ধারণ করেছিলেন। তিনি এদেশের জনসমাজের দুষ্টচক্র ও মনোজাগতিক দাসত্ব শৃঙ্খল ভাঙ্গার শুভ সূচনার মধ্য দিয়ে অনৈতিক আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ, দুর্বৃত্তায়িত রাজনৈতিক চক্র ও গণদুশমন পতিত স্বৈরাচারের টার্গেটে হয়েছেন।
নির্বিচার শক্তি ও আততায়ী বুলেট দিয়ে কোনা আদর্শিক শক্তির ইতিবাচক উত্থানকে দাবিয়ে রাখা যায়না। ওসমান হাদি বিএনপি, জামাত, এনসিপি, ইসলামি আন্দোলন, হেফাজতে ইসলাম, সমাজতান্ত্রিক বা বামপন্থার রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করতে যাননি। তিনি একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশের প্রত্যেক রাজনৈতিক দল ও প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য চ্যালেঞ্জ নয়, স্বচ্ছতা ও ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অবশ্যম্ভাবি করে তুলেছিলেন। যেকোনো দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে দেশের মানুষ তথা নতুন প্রজন্মের মধ্যে যে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রত্যাশা জেগে উঠেছে ওসমান হাদি সেই প্রত্যাশার প্রতিনিধি হয়ে উঠেছেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একজন ওসমান হাদির কন্ঠকে থামিয়ে দেয়া গেলেও তার প্রত্যাশিত সামাজিক-রাজনৈতিক আকাক্সক্ষার সম্মিলিত কণ্ঠস্বরের শক্তি বহুগুণে বেড়ে যাওয়ার নতুন সম্ভাবনার সোপানে উন্নীত হয়েছে। একজন ওসমান হাদিকে হত্যা করে ইনকিলাব মঞ্চের কার্যক্রম রুখে দিতে চেয়েছিল হন্তারকরা। জুলাই অভ্যুত্থানের নায়কদের ভয় ধরিয়ে দিতে এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী নতুন সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে রুখে দিতেই এ সময়ের সবচেয়ে স্বচ্ছ অবয়ব, সবচেয়ে সাহসী, শক্তিশালী ও বুলান্দ কন্ঠস্বর শরিফ ওসমান হাদিকে টার্গেট করা হয়েছিল। হাদির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সে প্রয়াস বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিরোধী অপশক্তির জন্য বুমেরাং হয়ে উঠেছে। ওসমান হাদি কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক নেতা নন, কোনো রাজপরিবার কিংবা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান নন, জনপ্রিয় কোনো রাজনৈতিক দলের সম্ভাবনাময় নেতাও নন। তিনি প্রচলিত রাজনৈতিক বয়ান, ধর্মীয় আবেগি বয়ান নিয়ে মাঠে নামেননি। শুধু চলমান সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতরে দীর্ঘদিনে জমে ওঠা বিষবাষ্পের বেলুনটিকে তিনি ফুটো করে দিতে শুরু করেছিলেন। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলের প্রবীন, প্রভাবশালী ধনাঢ্য নেতাদের ঘুম হারাম করে দেয়ার জন্য পরিবর্তনের পক্ষে ওসমান হাদির দৃঢ়তা, নতুন চিন্তার সাহসী কণ্ঠস্বর, সরল-সাদাসিধা জীবনযাপন প্রাণখোলা হাসি যেন বিধ্বংসী বুলডোজার হয়ে উঠেছিল। মাত্র ৩২ বছরের টগবগে তরুণ জুলাই যোদ্ধা ওসমান হাদির রেখে যাওয়া কণ্ঠস্বর এখন আগের চেয়ে বহুগুন বেশি শক্তি নিয়ে গগনবিদারি হয়ে ঘরে ঘরে বাজছে। তাঁর নতুন চিন্তার বীজ হেমিলনের বাঁশিওয়ালার মতো শিশু-কিশোর থেকে অশীতিপর বৃদ্ধ পর্যন্ত জনতার কাতারে টেনে নিয়ে এসেছে। ২০ ডিসেম্বর মানিক মিয়া এভিনিউতে ওসমান হাদির জানাজায় লাখ লাখ মানুষের কান্নাজড়িত কন্ঠের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নতুন বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে নতুনভাবে জাগিয়ে তুলেছে। এটাই ছিল, ওসমান হাদির সাম্প্রতিক সোসিও-কালচারাল অ্যাক্টিভিজমের মিশন ও ভিশন। তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে নিজের সম্ভাব্য অপঘাত মৃত্যুর আশঙ্কার প্রসঙ্গে গুরুত্বহীন, কর্মহীন দীর্ঘ জীবনের চেয়ে সমাজে ইম্প্যাক্ট সৃষ্টিকারী সংক্ষিপ্ত জীবনকেই বেছে নেয়া ও শহীদি মৃত্যুর স্বপ্নের কথা বলেছেন। তাঁর সেই স্বপ্ন প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি দৃঢ়, গভীর, বিস্তৃত ও উজ্জ্বলভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। আগামী শতবছর ধরে জুলাই বিপ্লবের তরুণদের প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগ জাতির স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার পথে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
হাদি শহীদ হওয়ার অনেক আগে থেকেই নানা মাধ্যমে হন্তারকদের কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছিল। তাদের তৎপরতা ও গতিবিধিও ছিল দৃশ্যমান। কিছুদিন পরপর শেখ হাসিনা ও তার দোসররা দিল্লিতে বসে সহিংসতা ও নাশকতার নির্দেশনা দিচ্ছিল। দেশের ব্যাংকিং সেক্টর ও আর্থিক খাতের লুটেরা অলিগার্ক এস আলম সিঙ্গাপুর থেকে দিল্লিতে গিয়ে হাসিনার সাথে বৈঠক করে বাংলাদেশে ডি-স্ট্যাবিলাইজেশন প্রোগ্রাম ও নির্বাচন বানচালের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে হাজার হাজার কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দের খবরও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। অত:পর একজন সেনা কর্মকর্তার নেতৃতে পলাতক আওয়ামী ক্যাডারদের গেরিলা অস্ত্র ট্রেনিংয়ের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষের জীবন ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশের অর্ন্তবর্তী সরকার জুলাই বিপ্লবের স্পিরিটকে ধারণ করতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তা নাহলে গণহত্যা ও রাষ্ট্র ধ্বংসের হোতারা অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে পতিত শত্রুদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেয়ার মত রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও মৃত্যুদন্ডযোগ্য ঘটনার পরও অপরাধির দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই কেন? কিলিং মিশন পরিচালনার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ কর্মীদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেয়ার অপরাধে গত জুলাই মাসে মেজর সাদিক নামের এক সেনা সদস্যকে হেফাজতে নেয়ার তথ্য জানিয়েছিল সেনা সদর। এরপর ৫মাস পেরিয়ে গেলেও সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানা যায়নি। জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী নানা কর্মকান্ডে সেনাপ্রধান ও সেনাবাহিনী জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। পিলখানা ম্যাসাকার থেকে শুরু করে গত দেড় দশকের গুম-খুন, টার্গেট কিলিং, ম্যাসকিলিং, আয়নাঘরের বিভীষিকাময় ঘটনাবলীর সাথে যারা জড়িত ছিল, তাদের বিচার প্রক্রিয়া দৃশ্যমান না হওয়ার পেছনে যাদের বিরুদ্ধে অনিচ্ছা কিংবা অসহযোগিতার যে অভিযোগ আছে, তার সত্যতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। পতিত স্বৈরাচারের কোটি কোটি টাকার কিলিং মিশন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত ১৫ বছরে পতিত স্বৈরাচারের দোসর আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাসীরা হাজার হাজার আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নিয়েছে। এসব লাইসেন্সধারিরা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানিতে প্রতিটি জনপদকে সন্ত্রস্ত করে রেখেছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের শেষ মুহূর্তে সারাদেশে শতাধিক থানা থেকে শত শত পুলিশ সদস্য অস্ত্রসহ লাপাত্তা হয়ে যায়, কোথাও কোথাও বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা থানা আক্রমণ করলে পুলিশের ছত্রছায়ায় থাকা হেলমেটধারি আওয়ামী সন্ত্রাসীরা পুলিশের অস্ত্র লুটে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ আছে। জুলাই অভ্যুত্থানের প্রায় দেড় বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। অর্ন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ইতিহাসের সবচেয়ে স্বচ্ছ, ভয়-ভীতিহীন ও উৎসবমুখর নির্বাচন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, অথচ হাজার হাজার সন্ত্রাসি অবৈধ অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়ালেও এসব অস্ত্র উদ্ধারে কোনো অভিযান কিংবা অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। হাদির মৃত্যুর পর সরকার সম্মুখ সারির জুলাই যোদ্ধা ও এনসিপি নেতাদের নিরাপত্তায় গানম্যান দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরই মধ্যে খুলনায় আততায়িরা মোতালেব শিকদার নামের একজন এনসিপি নেতাকে হাদির মতই মাথা লক্ষ্য করে গুলি করে পালিয়ে যায়। সারাদেশে হাজার হাজার জুলাই যোদ্ধা বা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের শুধুমাত্র গানম্যান দিয়ে নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব নয়। হত্যাকারিকে ধরে বিচারের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছিলেন ওসমান হাদি। আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র এখানে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ভারত থেকে নির্দেশিত ও পরিচালিত কিলিং মিশন নতুন বাংলাদেশের সব সম্ভাবনাকে ব্যর্থ করে দিতে চাইছে।
আধিপত্যবাদী ষড়যন্ত্র ও প্রোপাগান্ডা ন্যারেটিভ ও পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের নেক্সাস ইতিমধ্যে জুলাই বিপ্লবকে তার বিপ্লবী স্পিরিট থেকে বিচ্যুত করে তাকে শ্রেফ একটি রেজিম চেঞ্জ’র বাতাবরণে আবদ্ধ করেছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রত্যাশার মধ্যে কিছু অবধারিত দ্বন্দ্ব ও বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে। সেই বৈপরীত্যকে সাংঘর্ষিক অবস্থায় পৌঁছে দেয়াই গণশত্রুদের লক্ষ্য। এর সাথে ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও দুর্বৃত্তায়িত রাজনৈতিক শক্তির অস্তিত্বের প্রশ্ন জড়িত। পতিত স্বৈরাচারের কথিত ভোটব্যাংক ও অক্ষুণœ প্রাতিষ্ঠানিক-আমলাতান্ত্রিক প্রভাবকে নিজেদের পক্ষে নিতে বিএনপি-জামায়াতের মতো রাজনৈতিক দলগুলো আপস ও সমঝোতার পথ বেছে নিতে চাইলেও চুয়ান্ন বছরে বেড়ে ওঠা জঞ্জাল উপড়ে ফেলে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন, নিরাপদ নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন ও অক্ষুণœ রাখতে ওসমান হাদির মিশন ও শহিদী মৃত্যুর মহাকাব্যিক প্রেক্ষাপট অনেকটা কক্ষচ্যুত জুলাই বিপ্লবের স্পিরিটকে তরুণ প্রজন্মের চেতনায় আবার সঞ্চারিত করেছে। ওসমান হাদির হত্যাকারিদের গ্রেফতার করতে না পারা কিংবা নির্বিঘেœ ভারতে পালিয়ে যাওয়া এবং সেখানে তাদের নিরাপদ আশ্রয় বাংলাদেশের মানুষকে যে বার্তা দিয়েছে, তা ভারতীয় আধিপত্যবাদের পুরনো অবস্থানেরই পুনরাবৃত্তি। হাদি হত্যাকারিদের ভারতে আশ্রয় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর মধ্য দিয়ে জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের প্রতি ওরা সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। আর নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নবাজ বিপ্লবী তরুণ প্রজন্ম হাদির জানাজায় উপস্থিত হয়ে প্রতিজ্ঞা করে সে চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে প্রত্যাঘাতের প্রস্তুতির জানান দিয়েছে। প্রায় নিবু নিবু জুলাই বিপ্লবের স্পিরিট যেন ওসমান হাদির রক্তের জ্বালানিতে নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। ভারতীয় আগ্রাসন ও আধিপত্যবাদবিরোধী লড়াইয়ে ওসমান হাদি এখন মুক্তিকামী মানুষের প্রেরণা ও ঐক্যের প্রতীকে পরিনত হয়েছে। চব্বিশের জুলাইয়ের মধ্যভাগে রংপুরের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আবু সাঈদের প্রসারিত দুই হাত এবং স্বৈরাশাসকের দলবাজ পুলিশের গুলিতে লুটিয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছিল। এরপর দেড় বছর পদ্মা-যমুনায় অনেক পানি গড়িয়েছে। দেশে-বিদেশে অনেক ষড়যন্ত্র ও অপরাজনীতির গ্যাড়াকলে জুলাই অভ্যুত্থানকে ব্যর্থ করে দিতে সম্ভাব্য সবকিছুই হয়েছে। নিবন্ত জুলাই বিপ্লবের মশালে ইনকিলাব মঞ্চের ওসমান হাদি মাটির প্রদীপের মতো জেগেছিলেন। নজরুলের মতো ঝাঁকড়া চুলে দুই হাত প্রসারিত ওসমান হাদি নিজের রক্ত দিয়ে সেই মশালকে পুনরায় প্রজ্জ্বলিত করে গেলেন। বিদ্রোহী হাদিকে জাতি বিদ্রোহী কবি নজরুলের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত করেছে। দুর্নীতিবিরোধী ইনসাফের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে ওসমান হাদির জ্ঞানভিত্তিক সত্যাশ্রয়ী বাস্তব দৃষ্টান্ত আর কোনো ন্যারেটিভ দিয়ে ভেঙ্গে দেয়া যাবে না। দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়িত রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ওসমান হাদি এক জ্বলন্ত উদাহরণ।
bari_zamal@yahoo.com



